চার মাসে ধর্ষণসহ শিশু নির্যাতনের ৭৩ ঘটনায় মামলা হয়নি

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পরিসংখ্যান নয় বরং তা ধীরে ধীরে সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা এবং সচেতনতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি কয়েক মাসের তথ্য বলছে, সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরা কিন্তু সব ঘটনায় পৌঁছানো যাচ্ছে না আইনের দ্বারপ্রান্তে, যা নতুন করে উদ্বেগ ও ভাবনার জন্ম দিচ্ছে।
দেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়লেও সব ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ না হওয়া নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে।
একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১২৬টিতে মামলা হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল সর্বাধিক ১১৮টি। আর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ৪৬টি। অর্থাৎ, ৭৩টি সহিংসতার ঘটনাই আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
শুধু মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে। এছাড়া জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় ১১৫ শিশু নিহত হয়েছে।
আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে সংকট
সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ মনে করেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট হলেও মূল সংকট তৈরি হয়েছে সঠিক প্রয়োগে। তার ভাষায়, “আইনের কোনো ঘাটতি না থাকলেও বাস্তব সমস্যা হলো তদন্তের দুর্বলতা, প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি।”
তিনি বলেন, অধিকাংশ মামলার তদন্ত যথাযথভাবে না হওয়ায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতা দেখা যায়। ফলে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায় অথবা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং অনিয়মও বিচার প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচারকের সংখ্যা ও মামলার সংখ্যার মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সব ঘটনায় মামলা হয়নি কেন?
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সহিংসতার সংখ্যা বাড়লেও সব ঘটনায় মামলা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা কর্মীরা বলছেন, অনেক পরিবার সামাজিক চাপ, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় আইনি পদক্ষেপ নিতে চায় না। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে আপস-মীমাংসার চেষ্টাও করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া এবং আইনি জটিলতার ভয়ও মানুষকে মামলা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন, অভিযোগ করলেও ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে।
আবার কিছু পরিবার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কেও যথেষ্ট জানে না। কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কীভাবে মামলা করতে হবে কিংবা কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যায় এসব তথ্যের অভাবও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সচেতনতা কি পারবে পরিস্থিতি বদলাতে?
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না বরং প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও নিরাপদ সহায়তা ব্যবস্থা।
তাদের মতে, শিশু ও নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ও সহায়তা কেন্দ্র কার্যকর করতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীদের প্রতি সহমর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহিংসতার প্রতিটি সংখ্যা একেকটি জীবনের গল্প বহন করে। তাই এই পরিসংখ্যানকে শুধুমাত্র সংখ্যা হিসেবে না দেখে সামাজিক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
ভিওডি বাংলা/এমএস/এফএ







