মধ্যবিত্তের আস্থা ডিজিটাল গরুরহাটে

আসন্ন ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশে অনলাইন গরুরহাটে চোখে পড়ার মতো প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। দিন দিন বাড়ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোরবানির পশু কেনার প্রবণতা, যা দেশের প্রচলিত পশু বেচাকেনার ধরনে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, খামার মালিক ও অনলাইন উদ্যোক্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে অনলাইনে পশু বিক্রির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। বিশেষ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারা এখন অনলাইন লেনদেন, হোম ডেলিভারি এবং ডিজিটাল বিপণনের স্বচ্ছতার ওপর আগের চেয়ে বেশি আস্থা রাখছেন।
কয়েক বছর আগেও অধিকাংশ মানুষ কোরবানির পশু কেনার জন্য সরাসরি হাটে গিয়ে পশু দেখে কিনতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পশু কেনাকে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। তবে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
এখন বড় বাণিজ্যিক খামার থেকে শুরু করে ছোট কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তারাও ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে অনলাইনে কোরবানির পশুর প্রচার চালাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সময় সাশ্রয়, সহজ কেনাকাটা এবং বাড়তি স্বচ্ছতার কারণে ক্রেতারা অনলাইনমুখী হচ্ছেন।
দেশের কয়েকটি শীর্ষ খামারী জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এবার অনলাইনে বিক্রি ও ক্রেতার সাড়া দুটোই বেড়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার পরিচিত খামার ‘মেঘডুবি অ্যাগ্রো’জানিয়েছে, তারা চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০০টি গরু বিক্রি করেছে, যা আগের ঈদ মৌসুমগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
মেঘডুবি অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপক ওয়াহিদ বলেন, ‘এ বছর অনলাইনে আমাদের সাড়া অত্যন্ত ইতিবাচক।’
তিনি বলেন, ‘আগে ক্রেতারা অনলাইনে গরু কিনতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু এখন পুরো প্রক্রিয়াটি আরও পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য হওয়ায় তাদের আস্থা বেড়েছে।’
‘হাইজেনিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি’জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় তাদের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণনের দ্রুত বিস্তার এই খাতের পরিবর্তনে বড় ভূমিকা রাখছে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এখন অনেক খামার পেশাদার আলোকচিত্র, লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং, ড্রোন ফুটেজ ও ভিডিও কলের মাধ্যমে পশু দেখানোর ব্যবস্থা চালু করেছে।
এ ছাড়া পশুর ওজন, খাদ্যাভ্যাস, বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার বিস্তারিত তথ্যও অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে, যাতে ক্রেতারা সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
‘আমরা বুঝি, অনলাইনে গরু বেচাকেনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা,’ বলেন হাইজেনিক অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রির কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার আরেফিন।
তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা যে পশু কিনছেন, সে সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য চান। তাই আমরা স্বচ্ছতা ও গ্রাহকসেবার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে কয়েকটি খামার পশুচিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ও প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবস্থাও বজায় রাখছে। মেঘডুবি অ্যাগ্রো জানিয়েছে, তাদের সব পশু নিজস্ব উৎপাদিত খাদ্যে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লালন-পালন করা হয়।
একইভাবে সরকার অ্যাগ্রো জানিয়েছে, তারা নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত ঘাস ব্যবহার করে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু পালন করছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, এবার বাজারে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অধিকাংশ ক্রেতা ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকার মধ্যে দামের গরুর প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কয়েকটি খামার জানিয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে লালিত গরু এবং বিশেষ করে লাল রঙের গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারও অনলাইন পশু বেচাকেনাকে আরও গতিশীল করেছে। এখন ক্রেতারা খামারে না গিয়েই মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে বুকিং ও অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নগরবাসীর মধ্যে অনলাইনে পশু কেনার জনপ্রিয়তা বাড়ার অন্যতম কারণ হলো ঝামেলামুক্ত কেনাকাটা। যানজট, ভিড়পূর্ণ গরুরহাট এবং ব্যস্ত কর্মজীবনের কারণে অনেকেই এখন বাসা থেকেই স্মার্টফোনের মাধ্যমে কোরবানির পশু কিনছেন।
গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াতে অনেক খামার বিশেষায়িত পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও চালু করেছে। রাজধানীর বড় গরুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় ঢাকার মধ্যে বিনা খরচে পশু পৌঁছে দিচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরাসরি মাংস সরবরাহসহ পূর্ণাঙ্গ কোরবানি সেবাও দিচ্ছে।
পূর্বাচল ক্যাটল ফার্মের পরিচালনা ও বিক্রয় বিভাগের কর্মী সালমান বলেন, ‘ঝামেলামুক্ত এই সেবা ব্যবস্থা নগর পরিবারের মধ্যে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’
অনলাইন গরুরহাটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। কয়েকটি খামার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনলাইনে পরিবারের সদস্যদের জন্য কোরবানির পশু কিনছেন।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের পরও খাতটিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখা, ঈদের সময় তীব্র যানজটের মধ্যেও সময়মতো পশু সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অনলাইন প্রতারণা ঠেকানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অনলাইন প্রতারণার আশঙ্কায় কিছু ক্রেতা এখনো ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’ পদ্ধতিকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছরই মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনলাইন গরুরহাটের প্রসার দ্রুত বাড়লেও এখন এটি প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবর্তিত ভোক্তা আচরণের কারণে একটি টেকসই ব্যবসাখাতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী, দেশে ইন্টারনেট সুবিধা, পরিবহন ব্যবস্থা ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আরও উন্নত হলে আগামী বছরগুলোতে অনলাইন পশু বিপণনের পরিধি আরও বাড়বে।
‘গরু বেচাকেনার ভবিষ্যৎ ক্রমেই ডিজিটাল হয়ে উঠছে,’ বলেন ‘হাটবাজার.অনলাইন’ নামের একটি অনলাইন পেজের সঙ্গে যুক্ত খামারকর্মী হৃদয় সরকার।
তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা এখন সুবিধা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আর অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো সফলভাবেই সেই প্রত্যাশা পূরণ করছে।’
২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অনলাইন গরুরহাটের এই উত্থান দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি কীভাবে দেশের ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি ব্যবসাকে আধুনিক রূপ দিচ্ছে। ডিজিটাল বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কোরবানির পশু খাতও প্রবেশ করছে নতুন এক যুগে, যেখানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, গ্রাহকসেবা ও আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা হয়ে উঠছে কোরবানির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু







