আলোচিত মামলার রায় দ্রুত, বিচার ঝুলে বছরজুড়ে

মাগুরার শিশু আছিয়া, ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি, নোয়াখালীর সুবর্ণচরের গৃহবধূ কিংবা সিলেট এমসি কলেজের তরুণী—দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এসব ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার আদালতে রায় হলেও চূড়ান্ত বিচার এখনো ঝুলে আছে উচ্চ আদালতে। ডেথ রেফারেন্স, আপিল শুনানি, নথি জটিলতা ও মামলার অতিরিক্ত চাপের কারণে বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে এসব মামলার নিষ্পত্তি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর অপরাধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ। বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও উচ্চ আদালতে দীর্ঘসূত্রতা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আদালত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের মামলায় আইন অনুযায়ী প্রতিটি সাক্ষ্য, জবানবন্দি ও আলামত বিস্তারিতভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হয়। ফলে এসব মামলায় শুনানি দীর্ঘ হয়। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতে বেঞ্চ ও বিচারকের সংকটও মামলার জট বাড়াচ্ছে।
সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু বলেন, ধর্ষণ ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতি চাইলে আলাদা বেঞ্চ গঠন করতে পারেন। এতে দীর্ঘ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে এবং অপরাধ প্রবণতাও কমবে।
এডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, বিচারহীনতার কারণেই দেশে অপরাধ বাড়ছে। শিশু ধর্ষণের মতো আলোচিত মামলাগুলো নিম্ন আদালতে রায় হলেও উচ্চ আদালতে এসে আটকে যায়। দ্রুত বিচার নিশ্চিতে বিশেষ বেঞ্চ গঠন জরুরি।
গতকাল একদল আইনজীবী শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে শুনানিতে দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিচারহীনতার ধারণা তৈরি করছে।
সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মো. মাজহারুল হক বলেন, শিশু ধর্ষণসহ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিচারপতিরা আন্তরিক। প্রয়োজন হলে প্রধান বিচারপতি আরও পদক্ষেপ নিতে পারেন।
আছিয়া হত্যা: দ্রুত রায়, থমকে চূড়ান্ত বিচার
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের শিশু আছিয়া। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে।
এক মাসের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। দ্রুত বিচার শেষে ১৭ মে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তবে মামলাটি এখন ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে।
আছিয়ার পরিবারের অভিযোগ, দ্রুত রায়ের পর তারা ভেবেছিলেন বিচার দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা হতাশ।
নুসরাত হত্যা: ৬১ কার্যদিবসে রায়, তবু শেষ হয়নি বিচার
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে মামলা করায় তাকে চাপ দেয়া হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বিচার শেষ করে আদালত। অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানির কারণে মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ, দ্রুত বিচার হলেও এখনো তারা ন্যায়বিচারের শেষ ধাপ দেখতে পাননি।
সুবর্ণচর গণধর্ষণ: রায়ের পরও ঝুলে মামলা
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ করে, নির্দিষ্ট প্রার্থীকে ভোট না দেয়ার জেরেই এ হামলা চালানো হয়।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২০ সালে আদালত ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এমসি কলেজ: ক্ষোভের আগুন, বিচার এখনো চলমান
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আসে। দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়।
দ্রুত তদন্ত শেষে আদালত কয়েকজন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের কারণে মামলাটি এখনো উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/বিন্দু







