আওয়ামী লীগের ‘ফেরা’ নিয়ে আলোচনা বাড়ছেই

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার বিষয়টি। দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং আগামী দিনের ক্ষমতার সমীকরণে তাদের অবস্থান কী হতে পারে তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক, কূটনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
বিশেষ করে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস ও আনন্দবাজার পত্রিকাকে ইমেইলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিগগিরই দেশের মাটিতে ফেরার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করার পর আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তার ওই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন সবখানেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ কি আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে বড় পরিসরে ফিরতে যাচ্ছে?
‘ফেরার পথ’ তৈরি হয়েছে যেভাবে
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন। একাধিক ফেসবুক পোস্টে তিনি দাবি করেন, “২০২৪ কে ১৯৭১ এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো, ডানপন্থার উত্থান, মব সংস্কৃতির বিস্তার, সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে নীরবতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের পথ তৈরি করেছে।”
তিনি আরও লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের মজলুমগণ।”
একই ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। বুধবার (২০ মে) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি, তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।”
রাজনৈতিক মাঠে বাড়ছে প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পুনঃসক্রিয়তা নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতারা। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “যে দলের শীর্ষ নেতারা লাখ লাখ নেতাকর্মীকে ফেলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, সেই দলের এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।”
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ভারত সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা সম্পূর্ণ আইনি পথেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এরই মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। দিল্লিতে সেই দাবিরই পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে সবকিছু এই মুহূর্তে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
যদিও এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছে এবং শিগগিরই পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ নেই
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেছেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নামে মিছিল, সমাবেশ বা কর্মসূচি পালনের সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, গণহত্যার বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
একই সুর শোনা গেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি-এর চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর বক্তব্যেও। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসা সহজ হবে না এবং তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রত্যাবর্তন চায় না। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর মধ্যে দূরত্ব ও সংঘাত বাড়লে রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ লাভবান হতে পারে।
তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ টেনে বলেন, বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের অবনতি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরার পথ তৈরি করেছিল। তাই ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যার বিচার শেষ হওয়ার আগে দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসন বা দেশে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষায়, “দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে আর রাজনীতিতে মেনে নেবে না।”
একইভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এর উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, “বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাদের একমাত্র প্রত্যাবর্তন হতে পারে শুধু বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য।”
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ফেরার আলোচনা কেবল একটি দলের পুনঃসক্রিয়তা নয় বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে। একদিকে দলটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে তাদের ঘিরে বাড়তে থাকা আলোচনাই প্রমাণ করছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
এখন দেখার বিষয়, দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ আদৌ সাংগঠনিকভাবে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না, নাকি ফেরার আলোচনা কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ভিওডি বাংলা/এমএস







