রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাম চালুর পরিকল্পনা

রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসন এবং নগরবাসীর জন্য তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাম সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে রাজধানীর প্রগতি সরণি অথবা নগরীর অন্য কোনো উপযোগী সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাম পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে পরীক্ষামূলক ট্রাম সার্ভিস চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম চালু হলে নির্দিষ্ট রুটে যাত্রী পরিবহনে বাসের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে যানজট কমানোর পাশাপাশি নগর পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
জানা গেছে, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও যানজট নিরসনে গত ২৪ মার্চ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ট্রাম সার্ভিস চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। ওই সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগিরই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ট্রাম পরিচালনার জন্য উপযুক্ত সড়ক, অবকাঠামোগত ব্যয়, যাত্রী চাহিদা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে।
সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীর মতো অত্যন্ত জনবহুল ও ব্যস্ত নগরীর জন্য ট্রাম একটি কার্যকর ও উপযোগী গণপরিবহন হতে পারে। বিশেষ করে এমন সড়কে, যেখানে ঘন ঘন যাত্রী ওঠানামা করে এবং স্বল্প দূরত্বে অধিকসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করে, সেখানে ট্রাম একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে।
কার্যপত্রে ট্রাম সার্ভিসের বিভিন্ন সুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অন্যান্য ভারী গণপরিবহন ব্যবস্থার তুলনায় ট্রাম নির্মাণে কম ব্যয় হয়। একই ট্র্যাকে ট্রামের পাশাপাশি অন্যান্য যানবাহন চলাচলের সুযোগ থাকে। এছাড়া ট্রাম পরিচালনার জন্য তুলনামূলক কম জায়গা লাগে এবং এটি কম গতিতে নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রামের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম। একটি ট্রাম ৮ থেকে ১০টি ব্যক্তিগত গাড়ির সমপরিমাণ যাত্রী বহন করতে পারে। ফলে সড়কে যানবাহনের চাপ কমে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রগতি সরণিকে পরীক্ষামূলক ট্রাম পরিচালনার জন্য সম্ভাব্য রুট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাম চালুর মাধ্যমে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। সফল হলে ভবিষ্যতে রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও ট্রাম সার্ভিস সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাসভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে যানজট ও যাত্রী ভোগান্তি বেড়েছে। ট্রাম চালু হলে পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরে ট্রাম একটি জনপ্রিয় গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিবেশী ভারতেও কলকাতায় এখনও ট্রাম চলাচল করছে। উপমহাদেশে প্রথম ট্রাম চালু হয় কলকাতায় ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ আমলে। শুরুতে ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু থাকলেও পরে তা বাষ্পচালিত ইঞ্জিনে পরিচালিত হতো।
পরবর্তীতে ১৯০০ সালে কলকাতায় বৈদ্যুতিক ট্রাম চালু হয়, যা এশিয়ার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম সার্ভিস হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়। একসময় কলকাতায় ৫২টি রুটে ট্রাম চলাচল করলেও সময়ের সঙ্গে রুট সংখ্যা কমে আসে। বর্তমানে সেখানে সীমিত আকারে কয়েকটি রুটে ট্রাম চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় ট্রাম সার্ভিস চালুর আগে সড়ক ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চাহিদা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকার যানজট নিরসনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের দিকেই তাকিয়ে আছে নগরবাসী।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/আ







