অনলাইনে সক্রিয় তিন শতাধিক তেল কালোবাজারি

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের সুযোগ নিয়ে অনলাইনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অন্তত তিন শতাধিক কালোবাজারি চক্র। ফেসবুক মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন গ্রুপে প্রকাশ্যেই অকটেন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা বাজারদরের তিনগুণ পর্যন্ত দামে তেল বিক্রি করছে। অথচ দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফ্রেশ অকটেন’, ‘নূর অকটেন’, ‘অকটেন এভেইলএবল’- এমন নামের একাধিক ফেসবুক গ্রুপে নিয়মিত তেল বিক্রির পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। এসব পোস্টে আগ্রহ দেখিয়ে যোগাযোগ করলে বিক্রেতারা নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সরবরাহের আশ্বাস দেন। একজন বিক্রেতা জানান, দিনে সীমিত পরিমাণ তেল দেওয়া সম্ভব হলেও কয়েকদিনে ভাগ করে বড় অর্ডারও পূরণ করা যায়।
একটি গ্রুপে অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৪৫০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। অন্য এক বিক্রেতা দর কষাকষির পর ৪০০ টাকায় দেওয়ার প্রস্তাব দেন। আবার কোথাও ৩৫০ টাকা কিংবা ২৫০ টাকা লিটারদরেও বিক্রির প্রস্তাব দিতে দেখা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্রেতাকে নির্দিষ্ট লোকেশনে গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে বলা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্থ দেওয়ার শর্তও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনে শুধু বিক্রেতারাই সক্রিয় নয়, ক্রেতারাও বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দিয়ে তেল কেনার আগ্রহ জানাচ্ছেন। কেউ ৪-৫ লিটার, কেউবা ১০-১৫ লিটার অকটেনের জন্য আবেদন করছেন। আবার বড় অঙ্কের চাহিদাও দেখা গেছে এক পোষ্টে। ১৫০ লিটার অকটেনের জন্য পোস্ট দিয়ে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব চক্রের কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল মজুত থাকে। পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী তারা অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে সরবরাহ করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পেট্রোল পাম্পের অসাধু কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত দামে তেল সংগ্রহ করে। আবার অনেকেই পাম্পের লাইনে একাধিকবার দাঁড়িয়ে তেল কিনে মজুত করে পরে তা বেশি দামে বিক্রি করছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পেট্পারোল ম্পগুলোতে তেল সরবরাহ থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা শেষ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষকে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
নিউমার্কেট এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মনির জানান, প্রতিদিন রাতে তেলের জন্য লাইন দিতে হয়। স্থানীয় গার্ডদের হাতে ২০০ টাকা দিয়ে বাইক লক করে লাইনে রেখে যাই। সকালে ৯টায় এসে তেল নিয়ে হয়। তাছাড়া তেল নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, যেদিন লাইনে দাঁড়ানো সম্ভব হয় না, সেদিন বাধ্য হয়ে অনলাইনে বেশি দামে তেল কিনতে হয়।
নীলক্ষেত পেট্রোল পাম্পে তেলের লাইনে দাঁড়ানো আরও অনেকে এই অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।
সনি নামে এক চাকরিজীবী জানান, তিনি রাত ১১টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করেছেন। তার মতো প্রতিদিন হাজারো মানুষ এভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনে তেল বিক্রির বিষয়টি তাদের কাছে এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। ফলে প্রকাশ্যেই এসব অবৈধ লেনদেন চললেও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি।
তবে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা তদন্ত শুরু করেছেন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের সুযোগে গড়ে ওঠা এই কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পাম্প পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অবৈধ বিক্রয় কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা। তা-না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







