জ্বালানির প্রভাবে দূর্ভোগ বাড়ছে জনজীবনে

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, পরিবহন, কৃষি, শিল্পসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়বে। ফলে জনজীবনে নতুন করে চাপ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি ও পরোক্ষ ভাবে পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। প্রথমেই পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, এরপর শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আয়ের বিপরীতে ব্যয় বাড়তে থাকায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি হয়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে
নতুন দর। ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর চাপও তৈরি হয়েছে। দাম বাড়ার ঘোষণার পরপরই দূরপাল্লার বাস ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া সমন্বয়ের নির্দেশনা না থাকায় মালিকরা লোকসানে পড়ছেন। তিনি কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর দাবি জানান।
এদিকে ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে উঠে গেছে, যা রোজার সময় ছিল ৬০ টাকার মধ্যে। একইভাবে ডিমের দামও বেড়ে ডজনপ্রতি ১২৮ টাকায় পৌঁছেছে।
শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জেনারেটর ও যন্ত্রপাতি পরিচালনায় জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা থাকায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
কৃষি খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে সেচকাজে ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা খাদ্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা, শপিংমল ও হাসপাতালগুলোতে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব পণ্য ও সেবার দামে পড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিমানের জ্বালানির দাম বাড়লে ভাড়া বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়, যা পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে রাইড শেয়ারিং খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। পাঠাও ও উবারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত চালকদের জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, ফলে আয় কমে যাচ্ছে।
তবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.৭১ শতাংশে নেমেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান।
পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হকের মতে, ডিজেলের দাম এক ধাক্কায় ১৫ টাকা বাড়ানো অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, ডিজেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বেই, কারণ এটি পরিবহন ও কৃষিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটে ইতোমধ্যে উৎপাদন কমে গেছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে, যার প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







