• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

প্রস্তুত হচ্ছে মামলা: ছায়া তদন্তে উপদেষ্টা নূরজাহানের ‘দায়’

রুদ্র রাসেল    ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩২ এ.এম.
ছবি: ভিওডি বাংলা

নতুন সরকার চেয়ারে বসতেই হামের ভয়াবহতা প্রকাশ্যে আসে রাজশাহী মেডিকেলে কয়েকদিনের ব্যবধানে ২৬ শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সেই থেকে এ পর্যন্ত গত আড়াই মাসে দুই শতাধিক শিশু হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে বিদায় নিয়ছে এই অনিরাপদ পৃথিবী থেকে কিছু বুঝে ওঠার আগেই। 

এসব ঘটনায় দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে গেলে গত সাড়ে ৫ বছর ধরে হামসহ শিশুদের কিছু প্রয়োজনীয় টিকা প্রদানের ব্যবস্থা বন্ধ থাকাকে দায় দেওয়া হয় সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্তে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ দায় আওয়ামী লীগ  ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের- বিশেষ করে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এ দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। 

সবশেষ শনিবার (১৮ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, হামে মৃত্যুর জন্য দায়ীদের অপরাধ ক্ষমাহীন। 

এদিকে হামে মৃত্যুর প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ছায়া তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সংশ্লিস্টরা আরো নড়েচড়ে বসেন। শুরু হয় ছায়া তদন্তকারীদের অগ্রগতি লিপিবদ্ধসহ দায় চিহ্নিত করণের কাজ। ইতোমধ্যেই তারা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও সাবেক অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সরাসরি দায় চিহ্নিত করেছেন। তবে এ দায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পরবতৃীতে অন্তবর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসও এড়াতে পারেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে ছায়া তদন্তের খসড়া প্রতিবেদনে। যা প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চাওয়া মাত্র যাতে সরবরাহ করা যায়- সে লক্ষ্যে এসব ছায়া তদন্তের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে দপ্তরগুলোর প্রধানদের কাছে পাঠিয়েছেন মাঠ পর্যায়ে এবং তাদের উপরস্থ ধাপের কর্মকর্তারা। এসব প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যখাতে বিগত দিনে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে লুটপাট করেছে তাদের নামও যুক্ত করা হয়েছে। 

‘ঢালি সাপ্লাই লিমিটেড’সহ কয়েকটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের নামও এসেছে ছায়া তদন্তে, যারা স্বাস্থ্যখাতে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট গড়ে চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহের নামে লুটপাট চালিয়েছেন বেপরোয়াভাবে।
এর আগে গত ২৯ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি জানান, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা কর্মসূচি হয়নি। ফলে নবজাতকসহ যারা হামের টিকার আওতার বাইরে ছিল, তারাই এখন আক্রান্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা হামে মৃত্যুর বিষয়ে বিগত দুটি সরকারসহ বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগটিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এমনকি বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদার অনুপাতে হামের টিকা মজুত না থাকাসহ মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকটে কয়েক বছর ধরে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি। এর জন্য জনবল ঘাটতি ও টিকা কর্মসূচিতে নজরদারিরও অভাব ছিল। টিকা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত কর্মীদের মধ্যে ছিল অসন্তোষ। এছাড়া নিয়মিত বিশেষ টিকার ক্যাম্পেইনও হয়নি। এছাড়া হামের রুটিন টিকা কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ ভাগ শিশুকে আনা হয়নি টিকার আওতায়। বাদ পড়া শিশুরাই পাঁচ বছর অন্তর বিরাট সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। এসব কারণে মহামারির মতো হাম ছড়িয়ে পড়েছে। 

এজন্য বর্তমান সরকার বিগত দুই সরকারের গাফিলতি ও অদূরদর্শী পরিকল্পনাকে দায়ী করছে। যদিও স্বাস্থ্য খাতের ক্ষত সারাতে বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগও খুব বেশি জোরালো উদ্যোগ নেয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, কোনো রোগের বিস্তার যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন সেটি ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে’ পরিণত হয়। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতিকে জরুরি হিসাবে ঘোষণা করা হয়নি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক। মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতিবাচক ঘটনার দায় নিরূপণ কিংবা করণীয় ঠিক করতে সরকার চাইলে ‘তদন্ত কমিশন’ গঠন করে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে পারে। ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’-এ সরকারকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। 

ছায়া তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জন্মের পর থেকে ছয় ধরনের নিয়মিত টিকা না পেয়ে দেশের আরো অন্তত ৩০ লাখ শিশু ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাবেক অন্তর্বর্তী  অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও টিকা অব্যবস্থাপনাই দায়ী বলে অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। 

এ বিষয়ে এরই মধ্যে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা এবং সরকারকে একটি লিগ্যাল নোটিশ; পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকে একটি আবেদন দাখিল করা হয়েছে। এত কিছুর পরও বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তায় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচপিএনএসপি) চালু করে সরকার। এটি গৃহীত হয় অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এইচপিএনএসপি চালুর আগ পর্যন্ত টিকাসহ জনস্বাস্থ্যের অন্যান্য কার্যক্রম চলত শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে। সেগুলোর সব কটি এইচপিএনএসপির অধীনে নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ ধাপের এইচপিএনএসপি শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই করোনাকালীন সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে চতুর্থ ধাপ শেষ না করে আরো দুই বছরের জন্য বর্ধিত করা হয়। এর পর থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এই ধাপের প্রস্তুতি শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ওপির কার্যক্রম নিয়ে নানা আপত্তি তোলায় সেটি বাতিল করে এবং দুই বছর মেয়াদের একটি ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট প্রোফর্মা বা প্রোপোজাল (ডিপিপি) কর্মসূচি হাতে নেয়। এর অধীনে প্রথম বছরের জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়। কিন্তু টিকা কিনতে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নেমে আসে ট্র্যাজেডি।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ মনে করেন, বাজেট ও ক্রয়পদ্ধতির পরিবর্তনই সংকটের মূল কারণ। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘১৯৭৯ সাল থেকে টিকা কেনা হতো উন্নয়ন বাজেট থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটা পরিবর্তন করে রাজস্ব খাতে নেওয়ার ফলে টাকা ছাড়ের পদ্ধতিটা দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরে ইপিআইয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮৪২ কোটি টাকা। রাজস্ব খাত থেকে এই টাকা পাওয়ার জন্য আগে টিকা ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। এই পরিকল্পনা তৈরি হতেই সময় লেগে যায় গত বছর ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। এটি আবার মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়েছে। ধাপে ধাপে তা পাস করার পর সিদ্ধান্ত হয়, ৫০ শতাংশ টিকা কেনা হবে ইউনিসেফের মাধ্যমে, বাকি ৫০ শতাংশ কেনা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে। ইউনিসেফের মাধ্যমে ৫০ শতাংশ টিকা কেনা নিশ্চিত করতে সময় লেগে যায় দেড় থেকে দুই মাস। তা ছাড়া ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনতে হলে টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। ১০৯টি দেশে এই নিয়মেই কাজ করে আসছে ইউনিসেফ। আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার একটি সুবিধাও আছে। সেটি হচ্ছে—আমাদের যখন টিকার সংকট হয়, তখন টাকা অগ্রিম পরিশোধ না করার পরও প্রি-ফিন্যান্সিংয়ের (প্রাক-অর্থায়ন) মাধ্যমে কিছু টিকা দিতে পারে ওরা। এই ৪১৯ কোটি টাকার মধ্যে এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকার টিকা প্রাক-অর্থায়নের মাধ্যমে দিয়ে দিয়েছে ইউনিসেফ। সেই টিকা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বাকি ২১৯ কোটি টাকা ছাড় হলে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে বাকি টিকা পাওয়া যাবে। আর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার প্রক্রিয়াও চলমান। সম্ভবত আগামী ৯ মে দরপত্র আহবান করা হবে।’

ভিওডি বাংলা/আরআর/আরকেএইচ/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
আবদুস সালামের নেতৃত্বে পুনরুদ্ধারের পথে জিয়া সরণি খাল
আশায় এলাকাবাসী আবদুস সালামের নেতৃত্বে পুনরুদ্ধারের পথে জিয়া সরণি খাল
বিএনপির ওপর যে কারণে জেনারেল মাসুদের ক্ষোভ
বিএনপির ওপর যে কারণে জেনারেল মাসুদের ক্ষোভ
মনে পড়ে ২০০১ সালের সেই রক্তাক্ত সকাল? আজ সেই দিন
মনে পড়ে ২০০১ সালের সেই রক্তাক্ত সকাল? আজ সেই দিন