• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

এক্সপ্লেইনার:

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি কী বার্তা দিচ্ছে?

রুদ্র রাসেল    ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২৬ পি.এম.
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও: ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের সবশেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে ইসলামাবাদে। দুই দেশের প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তবে এই বৈঠকের একটি দিক বিশেষ নজর কেড়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি বা আগের দফার তুলনায় এই বৈঠকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব কমানোর বিষয়টি। কূটনীতিতে যাকে বলা হয় ‘ডাউনগ্রেডেড টকস্’, যেখানে বড় সিদ্ধান্তের বদলে অবস্থান যাচাই করা হয়। যাতে বড় ধরনের চুক্তির আশা কম থাকে এবং আলোচনা ‘টেস্টিং গ্রাউন্ড’ বা প্রাথমিক পর্যায়ে রাখা হয়। কূটনৈতিক অঙ্গনে এটি কেবল প্রোটোকলগত বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ  সূক্ষ্ম বার্তা বহন করে। 

ভিওডি বাংলার বিশ্লেষণ বলছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি মূলত চারটি সংকেত দেয়। প্রথমত- আলোচনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্বিতীয়ত- উভয় পক্ষের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত- যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকি কমিয়ে নমনীয় কৌশল নিতে চাইছে। আরেকটি ইঙ্গিত হলো- এটি এক ধরনের কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা।

সাধারণত এ ধরনের উচ্চঝুঁকির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক সরাসরি যুক্ত থাকেন, বিশেষ করে যখন ইস্যুটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো সংবেদনশীল। অতীতে পারমাণবিক চুক্তি ঘিরে আলোচনায়ও এমন নজির রয়েছে। কিন্তু এবারের বৈঠকে তুলনামূলকভাবে নিম্ন বা মধ্যম পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এই আলোচনাকে এখনো পরীক্ষামূলক বা প্রাথমিক স্তরে রাখতেই আগ্রহী।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি ‘লো-প্রোফাইল’ কূটনীতির একটি উদাহরণ, যেখানে প্রত্যাশা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে আনা হয়। এর ফলে যদি আলোচনায় বড় কোনো অগ্রগতি না-ও হয়, তাহলে রাজনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হয় না। একই সঙ্গে, এ ধরনের কাঠামোতে আলোচকদের কিছুটা নমনীয়তা থাকে—তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি ছাড়াই সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজে দেখতে পারেন।

২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরকালে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ ছয়টি বিশ্বশক্তি দীর্ঘ আলোচনার পর একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল। লক্ষ্য ছিল ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সীমিত করা। সে সময় উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উপস্থিত ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না।

পরিসংখ্যান বলছে, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সি (আইএইএ)-এর সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, ইরান বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করেছে-যা বেসামরিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ৩-৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি এবং অস্ত্র-গ্রেড (৯০ শতাংশ) পর্যায়ের কাছাকাছি। 

একই সঙ্গে ইরানের কাছে কয়েক হাজার সেন্ট্রিফিউজ সক্রিয় রয়েছে, যা দ্রুত আরও উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা বাড়ায়। এই পরিসংখ্যানই পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের মূল কারণ।  

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একসময় যেখানে দৈনিক প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, তা কমে কয়েক লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। 

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে, তবুও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইরানের অর্থনীতিতে এখনো দৃশ্যমান।

এই বাস্তবতায় ইসলামাবাদের আলোচনায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন আপাতত বড় কোনো কূটনৈতিক অঙ্গীকারে যেতে চাইছে না। বরং নিম্ন বা মধ্যম পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আলোচনাকে ‘পরীক্ষামূলক’ পর্যায়ে রাখা হচ্ছে। এতে একদিকে নমনীয়তা বজায় থাকে, অন্যদিকে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক চাপও কম থাকে।

ইরানের দিক থেকেও সরাসরি উচ্চপর্যায়ের সংলাপে অনীহা স্পষ্ট। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে আসছে এবং প্রায়ই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনাকে প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আস্থা গড়ে ওঠেনি, যা উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণকে সীমিত করে রেখেছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন প্রক্সি-সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা এবং ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক পথও খোলা রাখছে। এটি একটি ‘দ্বৈত কৌশল’।

সব মিলিয়ে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি একটি কৌশলগত সংকেত। এতে এটাই বোঝায় যে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় যুক্ত থাকলেও এখনই বড় ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানোর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়নি। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়ার অংশ। যেখানে তথ্য-উপাত্ত, কৌশল এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে ধীরে ধীরে অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা চলছে।

একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত করে যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে-যেখানে সংলাপ চলছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ এখনো অনেক দূরে।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার
চুক্তি হলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে প্রস্তুত ইইউ
চুক্তি হলে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে প্রস্তুত ইইউ
ক্যানসারে আক্রান্ত নেতানিয়াহু?
ক্যানসারে আক্রান্ত নেতানিয়াহু?