বিক্ষোভ জমাতে ঢাকায় লোক এনেছে এস আলম গ্রুপ

ইসলামী ব্যাংকসহ যে ছয়টি ব্যাংক থেকে দুই লাখ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে, সেই গ্রুপটি আবার ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে নানাভাবে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, লুট করা টাকা পুনুরুদ্ধারে সরকার যাতে আইনানুগ প্রক্রিয়া চালানোর পথে অগ্রসর না হয়-তা নিশ্চিত করতেই পরিকল্পিত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ছয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে রোববার (১৯ এপ্রিল) চাকরিচ্যুত কর্মীর ব্যানারে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় সড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে তারা চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। অবস্থানকারীরা কয়েকটি শর্ত জানিয়ে ১৫ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে ব্যাংকের সামনে থেকে সরে যায় বলে দুপুর ২টার দিকে জানায় পুলিশ।
এর আগে ইসলামী ব্যাংকসহ ৬টি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে রয়েছে তারাও আশপাশে অবস্থান নেন। উভয় গ্রুপের মহড়ায় সপ্তাহের প্রথম দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মতিঝিলজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করে। ঘটনাস্থলে র্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়।
অন্যদিকে এস আলম গ্রুপের এমন তৎপরতায় শঙ্কা বাড়ছে আমানতকারীদের। গ্রুপটির হাত থেকে ব্যাংক ৬টির নিয়ন্ত্রণ বেরিয়ে যাওয়ার পর আমানতকারীদের মধ্যে যে স্বস্তি ফিরেছিল এবং তারা যতটা ব্যাংকমুখী হতে উৎসাহিত হচ্ছিলেন-ততটাই উদ্বেগ বেড়েছে গ্রুপটির তৎপরতার খবরে।
এস আলম গ্রুপ বা এমন লুটেরা কোনো শক্তির হাতে এগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে আমানতকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিবে বলে মনে করছেন ব্যাংকখাতের বিশ্লেষকেরা।
এদিকে এই উত্তেজনা কেন্দ্র করে প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিভাবে গুরুত্বপূর্ণ মতিঝিল এলাকায় জরুরি কাজে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।
অবস্থান কর্মসূচির কারণে দৈনিক বাংলা মোড় থেকে আরকে মিশন রোড, শাপলা চত্বর থেকে ফকিরাপুল মোড়, নয়াপল্টনসহ আশপাশের এলাকায় যানজট তৈরি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন কয়েক হাজার মানুষ।
ঘটনাস্থলে দায়িত্বপালনকারী একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভিওডি বাংলাকে বলেন, অবস্থান নেওয়া লোকজনের বেশিরভাগই চট্টগ্রামের পটিয়ার। যেখানে এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম মাসুদের বাড়ি। শিল্পগ্রুপটি অফিস খোলার প্রথম দিনকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে এ অবস্থান কর্মসূচির নামে জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে কি-না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটা স্পষ্ট যে, এই অবস্থান কর্মসূচি ও ইসলামী ব্যাংকসহ ৬টি ব্যাংকে নতুন সরকারের নীতি অনুযায়ী যে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে, সেই শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি পরিকল্পিতভাবে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে এস আলম গ্রুপ।
অবস্থানকারীদের দাবি, তারা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত কর্মী। তাদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল, এস আলমের হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করা।
তবে অনুসন্ধান করে এই অবস্থান কর্মসূচির আড়ালে এসআলম গ্রুপের ইন্ধন ও স্বার্থের খেলা স্পষ্ট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ চট্টগ্রামের পটিয়া এলাকার বাসিন্দা। এই এলাকাতেই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বাড়ি।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যাংক রেজুলেশনে আগের মালিকদের ব্যাংকে ফেরার সুযোগ দিয়ে আইন পাস করার পর চাকরিচ্যুত কর্মীরা সরব হয়ে ওঠেন। গত দুই দিন ধরে পটিয়া থেকে লোক এনে ঢাকায় অবস্থান করানো হয়। শনিবার কয়েক হাজার মানুষ ঢাকায় পৌঁছান। রাতে রাজধানীর বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করেন।
বিক্ষোভকারীরা রোববার সকাল থেকে মতিঝিলের ব্যাংকপাড়া এবং সচিবালয়ের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তারা বলেন, আমাদের কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমরা অতিদ্রুত চাকরি ফেরত চাই। চাকরি ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি ৫ আগস্টের আগের মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরত দেওয়ার দাবি তুলে ধরেন।
যদি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাবি না মানা হয় তাহলে বড় আন্দোলনের গড়ে তোলার হুঁশিয়ার দিয়ে ব্যাংকের সামনে থেকে তারা সরে যান।
এসব ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে শুরুতে কর্মীদের শিক্ষাসনদ যাচাই করা হয়। এরপর একটি মূল্যায়ান পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। সেই পরীক্ষায় যারা অংশ নেননি এবং যাদের সনদে জালিয়াতি পাওয়া গেছে, কেবল তাদেরই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ফলে তাদের ফেরানোর সুযোগ নেই।
তারা জানান, এসব বাংক থেকে নামে-বেনামে এস আলমের প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা বের করার তথ্য-প্রমাণ পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কারণে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো অবস্থা না থাকায় এরই মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। আল-আরাফাহ ইসলামী ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/আরকেএইচ/এসআর







