• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

রমনা বটমূলে বোমা হামলা: বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতায় শুকিয়েছে রক্তের দাগ, শুকিয়েছে শোক

রুদ্র রাসেল    ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৬ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের সকালে রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলাকালে ঘটে যায় ভয়াবহ বোমা হামলা। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সাংস্কৃতিক উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যু, আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশে। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। আহত হন বহু মানুষ। এই ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও নৃশংস হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।

ঘটনার সময় রমনা বটমূল ছিল বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের প্রধান কেন্দ্র। ভোরের আলো ফুটতেই মানুষ জড়ো হয়েছিল গান, কবিতা এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করতে। ছায়ানটের শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করছিলেন। “এসো হে বৈশাখ” গানের মধ্য দিয়ে যখন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, ঠিক তখনই ঘটে বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ ভেঙে পড়ে এবং পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও চিৎকার।

ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকার, রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ এই হামলার নিন্দা জানায়। এটি শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা ছিল না, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঘটনার পর রমনা থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়—একটি হত্যা মামলা এবং একটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা। তদন্তে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি)-এর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০০৮ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এতে মোট ১৪ জনকে আসামি করা হয়।

২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ১৪ জন আসামির মধ্যে ৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করে, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হামলা, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক সমাবেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং জনগণের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুফতি আবদুল হান্নান, যিনি হুজি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অন্য একটি মামলায়—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন এবং ২০১৭ সালে তার সেই রায় কার্যকর করা হয়। ফলে রমনা বটমূল মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত তালিকা থেকে তিনি বাস্তবিকভাবে বাদ পড়েন।

অন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ছিলেন আতাউর রহমান সান, মজিবুর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল কাইয়ুম, জাহিদুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আলী (নাম বিভিন্ন নথিতে সামান্য ভিন্নভাবে পাওয়া যায়)। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা আবদুস শুকুর, আবদুল কাদের, আবদুল হাই, মোস্তফা কামাল, আবদুর রশিদ এবং সাইফুল ইসলাম।

রায়ের পর আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ ডেথ রেফারেন্স দাখিল করে। ফলে মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। বছরের পর বছর ধরে এটি শুনানির অপেক্ষায় থেকে যায়। নথি প্রস্তুত, বেঞ্চ পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মামলার অগ্রগতি ধীর হয়।

২০২৫ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ বিচারিক অবস্থা অনুযায়ী, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শেষ হয়েছে এবং মামলাটি এখন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত রায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর মামলাটি এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছেছে।

এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলা বিচার ব্যবস্থার জটিলতা, প্রক্রিয়াগত ধীরগতি এবং উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার একটি উদাহরণ।

ঘটনার পর রমনা বটমূল এবং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়। প্রবেশপথে একাধিক চেকপোস্ট, সিসিটিভি নজরদারি, গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন নিয়মিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় জনসমাগমের এই উৎসব এখন বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়।

তবুও ছায়ানট প্রতিবছর রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে যাচ্ছে। তাদের মতে, এই আয়োজন বন্ধ করা মানে সাংস্কৃতিক চেতনার পরাজয় মেনে নেওয়া। তাই নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা অনুষ্ঠান অব্যাহত রেখেছে, যা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রমনা বটমূল আজ তাই একদিকে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের কেন্দ্র, অন্যদিকে একটি ভয়াবহ সহিংস ঘটনার স্মৃতিচিহ্ন। এই দুই বিপরীত অনুভূতি—আনন্দ ও বেদনা—একসাথে বহন করে এটি পরিণত হয়েছে জাতীয় স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশে।

সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে এসে রমনা বটমূল বোমা হামলা মামলা এখন চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই বিচারপ্রক্রিয়া শেষের দিকে পৌঁছালেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সামাজিক প্রভাব এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আজও গভীরভাবে বিদ্যমান।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
উত্তরাঞ্চলে হবে চিকিৎসা মহাকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক হচ্ছে বিমানবন্দরও
উত্তরাঞ্চলে হবে চিকিৎসা মহাকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক হচ্ছে বিমানবন্দরও
সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লো অধ্যক্ষ্যের ঘুষ, কলেজ না করার দৃশ্য
সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লো অধ্যক্ষ্যের ঘুষ, কলেজ না করার দৃশ্য
জুলাইযোদ্ধাদের এক ছাতায় আনতে চায় এনসিপি
আলোচনায় রুমিন ফারহানাও জুলাইযোদ্ধাদের এক ছাতায় আনতে চায় এনসিপি