• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

সুন্দরবনে মাথাচাড়া দিয়েছে ‘বড় জাহাঙ্গীর’ আর ‘দয়াল বাহিনী’

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৪ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

একসময় র‌্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও কয়েক বছরের ব্যবধানে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে বনদস্যু চক্র। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ‘বড় জাহাঙ্গীর’ ও ‘দয়াল বাহিনী’ নামে কুখ্যাত দুটি গ্রুপের পুনরুত্থান স্পষ্ট হচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে কোস্টগার্ডের ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এই অভিযানের অংশ হিসেবে পৃথক দুটি অভিযানে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ এক দস্যুকে আটক এবং অপহৃত দুই জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিকালে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন মোংলার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কোস্টগার্ড জাহাজ বিসিজিএস তৌফিকের নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট আশিকুল ইসলাম ইমন জানান, বুধবার (১৫ এপ্রিল) মোংলার জয়মনিঘোল এলাকার শুয়োরমারা খালে মাছ ধরার সময় বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা দুই জেলেকে অপহরণ করে। অপহরণের পর তাদের নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার মুর্তি খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি মাছ ধরার নৌকাসহ মহিদুল শেখ (৩৫) ও তরিকুল শেখ (২৫) নামে দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযানের সময় দস্যুরা জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে শুক্রবার সকালে সুন্দরবনের হোগলডরা খাল এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২টি একনলা বন্দুক ও ৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজসহ দয়াল বাহিনীর সদস্য তরিকুল (৩৫) কে আটক করা হয়। তিনি খুলনার কয়রা উপজেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যুতার সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্বের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে র‌্যাবের নেতৃত্বে পরিচালিত আত্মসমর্পণ কর্মসূচির আওতায় সুন্দরবনের অন্তত ৩০টির বেশি দস্যু বাহিনীর প্রায় ৩৫০ জন সদস্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে দীর্ঘদিনের দস্যুতার অবসান ঘটিয়ে সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়। সেই সময় শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও হাজার হাজার রাউন্ড গুলি জমা পড়ে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই কর্মসূচির পর টেকসই নজরদারি ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পর্যাপ্তভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় কিছু দস্যু পুনরায় সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পায়। বিশেষ করে উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার অভাব, নদীভিত্তিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা এবং সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে নতুন করে ছোট ছোট দলে দস্যুতা শুরু হয়।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বড় আকারের বাহিনীর পরিবর্তে ৫-১০ জনের ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দস্যুরা অপহরণ, চাঁদাবাজি ও লুটপাট চালাচ্ছে। তারা গভীর বনাঞ্চলের খালগুলোকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে, যেখানে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের ভৌগোলিক জটিলতা—বিশাল বনভূমি, অসংখ্য নদী ও খাল, সীমিত নজরদারি অবকাঠামো—দস্যুদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার বড় কারণ। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি যেমন ড্রোন, নদীপথে আধুনিক টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার না হলে এই সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।

কোস্টগার্ড জানিয়েছে, আটক দস্যুর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপহৃত জেলেদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও চলমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত রাখতে হলে শুধু অভিযান নয়, বরং সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন—যার মধ্যে থাকবে নিয়মিত যৌথ বাহিনীর অভিযান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোস্টগার্ডের চলমান ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ দস্যু দমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও, দস্যুদের পুনরুত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সুন্দরবনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

ভিওডি বাংলা/আরআর/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
গ্রামবাংলা থেকে ভুলে যাচ্ছে বাংলা সন, মাস ও তারিখ
গ্রামবাংলা থেকে ভুলে যাচ্ছে বাংলা সন, মাস ও তারিখ
ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে আসছে পরিবর্তন
জাতীয় কাউন্সিল ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বে আসছে পরিবর্তন
আন্দোলন চাঙ্গা হলে সরকার কেন ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে
আন্দোলন চাঙ্গা হলে সরকার কেন ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে