দেশজুড়ে আলোচিত একটি মামলা
ঠান্ডা মাথার ধর্ষণ ও হত্যা, বিচার পেতে লাগে ১৮ বছর

বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে আলোচিত শাজনীন তাসনিম রহমান হত্যা মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি পেতে সময় লাগে প্রায় ১৮ বছর। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের নিজ বাড়িতে ১৫ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত হয়েছিল পুরো দেশ। দীর্ঘ তদন্ত, একাধিক আদালতে বিচার, আপিল, রিভিউ এবং আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।
১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানের নিজ বাসায় খুন হন ট্রান্সকম গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মেয়ে, স্কলাস্টিকা স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাজনীন তাসনিম রহমান।
ঘটনার পরদিন শাজনীনের বাবা লতিফুর রহমান গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সিআইডি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পৃথক ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করে।
মামলা ঘিরে আইনি জটিলতা
তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১ এবং ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। উভয় আদালতেই অভিযোগ গঠন করা হলে আসামিরা হাইকোর্টে আবেদন করেন।
১৯৯৯ সালের ৬ জুলাই বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল করিম ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থগিত রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বিচার চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
রায়ে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেন, ধর্ষণ ও হত্যা দুটি পৃথক অপরাধ এবং সেগুলোর বিচারও আলাদাভাবে হতে পারে।
পরে আসামিরা আপিল বিভাগে গেলে ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। সর্বোচ্চ আদালত বলেন, এ ঘটনায় প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ফলে একই অপরাধে দ্বৈত বিচার হওয়ার প্রশ্ন আসে না।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিচারক কাজী রহমতউল্লাহ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শাজনীনকে ধর্ষণ ও হত্যার পরিকল্পনা এবং সহযোগিতার দায়ে ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, গৃহভৃত্য শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ, ঠিকাদার সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন হাসান, তাঁর সহকারী বাদল, গৃহপরিচারিকা দুই বোন এস্তেমা খাতুন (মিনু) ও পারভীন এবং কাঠমিস্ত্রি শনিরাম মণ্ডল।
হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়
বিচারিক আদালতের রায়ের পর মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে যায়। একই সঙ্গে আসামিরাও আপিল করেন। ২০০৬ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্ট শনিরাম মণ্ডল ছাড়া বাকি পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
পরবর্তীতে চার আসামি লিভ টু আপিল করেন এবং শহীদ জেল আপিল দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৬ সালের ২ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ শহীদুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং বাকি চার আসামিকে খালাস দেন।
‘ঠান্ডা মাথার নৃশংস হত্যাকাণ্ড’
রায়ের পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণে সর্বোচ্চ আদালত এই ঘটনাকে “ঠান্ডা মাথার নৃশংস হত্যাকাণ্ড” হিসেবে উল্লেখ করেন।
আদালত বলেন, ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তার নিজ শয়নকক্ষে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, যে স্থানটি তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল। আদালতের ভাষায়, এটি ছিল সমাজের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ এবং বিচারিক বিবেককে নাড়া দেওয়া একটি ঘটনা।
রায়ে আরও বলা হয়, আসামি শহীদ ভিকটিমের গৃহভৃত্য হিসেবে তার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে ভয়াবহ এই অপরাধ সংঘটিত করেন।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, এমন পূর্বপরিকল্পিত ও নিষ্ঠুর অপরাধে সহানুভূতির কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় বিচার প্রক্রিয়া চললেও তা মৃত্যুদণ্ড কমানোর কারণ হতে পারে না।
রিভিউ খারিজ ও রায় কার্যকর
পরবর্তীতে শহীদুল ইসলাম রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়। এর মধ্য দিয়ে মামলার সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়।
দীর্ঘ ১৮ বছরের বিচারিক লড়াই শেষে ২০১৭ সালের নভেম্বরে কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে শাজনীন হত্যা মামলা এখনও একটি বহুল আলোচিত ও নজিরবিহীন মামলা হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভিওডি বাংলা/এমএস/এফএ







