সীমান্তে ভারতের আস্থার সংকট, তিস্তা চুক্তিতেও অনিশ্চয়তা

পুশইন অভিযোগ, সীমান্তে গোলাগুলি ও একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কাঁটাতারের দুই পাশের এই অস্থিরতা এখন আর কেবল নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের কূটনৈতিক সমীকরণ ও আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতার গভীরে। তিস্তা চুক্তির দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যু, বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন মূল্যায়নের মুখে, যেখানে ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও কৌতূহল।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত বিজেপি সরকার সীমান্ত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই শুভেন্দু অধিকারী সীমান্ত সিল, দ্রুত কাঁটাতার নির্মাণ এবং বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। এছাড়াও ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা জোরদারে ১২০ একর জমি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করেছে তার সরকার। হঠাৎ নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার এই উদ্যোগকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি, বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়নের জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কোন দিকে গড়াবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বেশ অনিশ্চয়তা।
কাঁটাতারের সীমান্তে আস্থা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্ত ঘিরে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, পুশইন এবং মাঝে মাঝে সংঘর্ষের অভিযোগ প্রায় প্রতিনিয়তই দুই দেশের আলোচনায় উঠে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে কয়েকটি প্রাণঘাতী ঘটনার পর বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয় বরং এটি দুই দেশের পারস্পরিক আস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের একটি অংশের অভিযোগ, আগের তুলনায় অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বেড়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
অমীমাংসিত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অন্যতম। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও মেলেনি চূড়ান্ত সমাধান।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় একটি খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছালেও তা স্বাক্ষরিত হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই খসড়া চুক্তির বিরোধিতা করেন। তার আপত্তির কারণে চুক্তিটি বাস্তবায়ন হয়নি।
ভারতের ফেডারেল কাঠামো অনুযায়ী, পানি বণ্টনের মতো আন্তঃরাজ্য ও আন্তঃসীমান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কেন্দ্রীয় সরকার এককভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে। বিজেপি সংসদ সদস্য জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, “উত্তরবঙ্গের স্বার্থের সঙ্গে আপস করে কোনো পানি বণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য এক বিজেপি বিধায়ক বলেন, “তিস্তার পানি ছেড়ে দেওয়া উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে।”
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০১১ সালের খসড়া চুক্তি বর্তমান পরিস্থিতিতে পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে ঢাকা আশা করে।
একইসঙ্গে বাংলাদেশ তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় বিকল্প উদ্যোগও এগিয়ে নিচ্ছে। তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “শুধু অপেক্ষা করে থাকা সম্ভব নয়।” যা বিকল্প উদ্যোগের প্রতি ঢাকার অবস্থানকে ইঙ্গিত করে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা ইস্যু এখন কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয় বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা ইস্যু এখন শুধু পানিবণ্টনের প্রশ্ন নয় এটি এখন দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আস্থার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বদলে যাওয়া আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চীনের প্রভাব মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখন কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয় বরং আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
বন্দর, রেল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে বাংলাদেশ-ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও কিছু ইস্যুতে কূটনৈতিক সতর্কতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সহযোগিতা ও অনিশ্চয়তার সম্পর্ক
বিশ্লেষকদের মতে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশ ও ভারতকে দীর্ঘমেয়াদে একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই রাখবে। তবে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তিস্তা ইস্যুতে অগ্রগতি এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন জরুরি হয়ে উঠেছে।
একসময় যে সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়ার “মডেল প্রতিবেশী কূটনীতি” হিসেবে দেখা হতো, সেখানে হঠাৎ দুই দেশের এতটা দূরত্ব ভু-রাজনীতিতেও বিশেষ প্রভাব ফেলছে।
তিস্তার পানির মতোই দুই দেশের সম্পর্কও এখন এক ধরনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সহযোগিতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে দূরবর্তী অনিশ্চয়তাও।
ভিওডি বাংলা/এমএস/এফএ







