‘রঙিন কার্ডের’ আড়ালে চলছে রমরমা দেহব্যবসা

রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ কিংবা অলিগলি—পা বাড়ালেই এখন চোখে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট রঙিন ভিজিটিং কার্ড। নীল, লাল কিংবা গোলাপি রঙের এসব কার্ডজুড়ে বড় হরফে লেখা বিভিন্ন রহস্যময় ‘ভাইয়ের’ নাম। সাথে মোবাইল নম্বর আর ‘শতভাগ নিরাপদ’ থাকার নিশ্চয়তা। কোথাও এসি বা নন-এসি রুমের প্রলোভন, আবার কোথাও সরাসরি যোগাযোগের আহ্বান। প্রথম দেখায় সাধারণ হোটেলের বিজ্ঞাপন মনে হলেও, এই রঙিন কাগজের আস্তরণের নিচেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর অন্ধকার জগতের হাতছানি। মূলত আবাসিক হোটেলের ভিজিটিং কার্ডের আড়ালে চলছে রমরমা দেহব্যবসা ও ব্লাকমেইল করে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার কারবার।
সরেজমিনে রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, কাওরান বাজার ও শ্যামলী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার বিভিন্ন ফুটপাতে, ফুটওভার ব্রিজে ছড়িয়ে আছে শত শত কার্ড। কার্ডগুলোতে বড় হরফে লেখা ‘ইমন ভাই’, ‘ফাহিম ভাই’ কিংবা ‘আরিফ ভাই’—এমন সব নাম। সাথে রয়েছে শতভাগ নিরাপত্তার প্রলোভন।
পরিচয় গোপন রেখে কার্ডে থাকা একাধিক নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ওপাশ থেকে মিলল রমরমা এই কারবারের তথ্য। ‘ইমন ভাই’ পরিচয়ধারী একজনকে ফোন করলে তিনি মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের শাহ আলী প্লাজার সামনে এসে সরাসরি দেখা করতে বলেন। সার্ভিসের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি বলেন, "১৬ বছর থেকে শুরু করে সব বয়সী মেয়ে রয়েছে আমাদের কাছে। পছন্দমতো বেছে নিতে পারবেন।"
কার্ডে থাকা ‘আরিফ ভাই’ নামের আরেকজন অভয় দিয়ে বলেন, "পুলিশের ভয় নাই ভাই, সব জায়গায় লাইন করা আছে। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি, বাকিটা আল্লাহর ওপর ভরসা।"
এছাড়াও কার্ডে থাকা একাধিক নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ওপাশ থেকে মুহূর্তেই গ্রাহকের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। কোনো ভূমিকা ছাড়াই দালালেরা সুনির্দিষ্ট ‘স্পটের’ ঠিকানা দিয়ে সেখানে দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদ দেয়। কী কারণে ফোন করা হয়েছে, তা জানার আগেই তারা তথাকথিত ‘সার্ভিসের’ বিস্তারিত বর্ণনা দিতে শুরু করে। তাদের এই তৎপরতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, এসব কার্ড কোনো সাধারণ হোটেলের বিজ্ঞাপন নয়, বরং অসামাজিক ব্যবসার খদ্দের সংগ্রহের একটি সুকৌশলী ফাঁদ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব চক্র গ্রাহকদের ডেকে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে এবং সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
উন্মুক্ত স্থানে এমন প্রচারণায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। ফার্মগেট এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী রফিক হোসেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "পরিবার নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটা দায়। ছোট ছোট বাচ্চারা এসব কার্ড কুড়িয়ে নেয়, রঙিন ছবি দেখে প্রশ্ন করে। সমাজের নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে ঠেকেছে যে এভাবে প্রকাশ্যে অসামাজিক কাজের কার্ড বিতরণ করা হয়!"
মিরপুর-১০ নম্বর ফুটওভার ব্রিজের পাশের এক কাপড় ব্যবসায়ী আক্ষেপের সুরে বলেন, "সকালে দোকান খোলার সময় দেখি শয়ে শয়ে কার্ড দোকানের সামনে পইড়া রইছে। ছোট ছোট পোলাপান এইগুলা হাতে নেয়, কার্ডের ছবি দেইখা হাসাহাসি করে। আমাগো চোখের সামনেই তো সমাজটা নষ্ট হইতাছে। পুলিশের সামনেই তো সব হয়, তারা চাইলে কি আর এসব চলতে পারে? কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ কিছু কইতে পারি না। যারা এই ব্যবসা চালায় তারা অনেক পাওয়ারফুল। কিছু কইলেই মারামারি করতে আসে, হুমকি দেয়। ডরে কেউ মুখ খুলে না।"
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, "এ সমস্যাটি অনেক এলাকায় বিদ্যমান। আমরা এসব কার্ড যারা ছড়ায়, তাদের শনাক্ত করে নিয়মিত ব্যবস্থা নিচ্ছি। পাশাপাশি বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে ডিএমপি অধ্যাদেশ কিংবা সংক্ষিপ্ত বিচারে ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে উপস্থাপন করে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।"
এই রঙিন কার্ডগুলো কেবল একটি বিজ্ঞাপন নয়, বরং একটি বড় অপরাধচক্রের সুনিপুণ ফাঁদ। সাধারণ মানুষকে এসব প্রলোভনে পা না দেওয়ার এবং সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ভিওডি বাংলা/এমআই/আ







