তদবিরবাজদের ভীড়ে ত্যাগীরা যেন তীর্থের কাক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত, দলীয় কমিটিতে ঠাঁই না পাওয়ার পাশাপাশি এবং যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির সরকার গঠনের দুই মাস পেরিয়েছে। এরই মধ্যে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূল নেতাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বেড়েছে তদবিরবাজদের ভীড়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যেন 'তৃনমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তীর্থের কাক।
দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, প্রয়োজনের সময় তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। এখন তাদের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এর ফলে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ত্যাগী কর্মীদের এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
বঞ্চিত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দল ও সরকারের দায়িত্বে থাকা নেতারা নিয়মিত মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। তাদের খোঁজখবর নিলে কিংবা দলীয় কার্যালয়ে সময় দিলে অনেক ক্ষোভ প্রশমিত হতো। এজন্য দলীয়ভাবে মন্ত্রী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের দলীয় কার্যালয়ে সময় দেওয়ার পরামর্শও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজ নিয়ে দলীয় কার্যালয়ের পরিবর্তে সচিবালয়মুখী হচ্ছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের একাধিক সূত্র বলছে, ত্যাগী নেতাকর্মীদের ধারাবাহিকভাবে অবমূল্যায়ন করা হলে তা দলীয় সংগঠনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে সাংগঠনিক দুর্বলতা যেমন বাড়বে, তেমনি নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী ভেতরে ভেতরে হতাশায় ভুগছেন। তারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারেন না, আবার পরিস্থিতি মেনেও নিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, তিনি এবং জুনিয়র পর্যায়ের দুই-একজন ছাড়া দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আর কেউ আসেন না। অথচ দলের ডেডিকেটেড কর্মীদের নানা কাজ থাকে, যা নিয়মতান্ত্রিকভাবেই করা সম্ভব।
তিনি অভিযোগ করেন, এখন দলীয় কার্যালয়ে প্রকৃত কর্মীদের চেয়ে তদবিরবাজদের উপস্থিতিই বেশি। দীর্ঘদিন রাজপথে অনুপস্থিত থাকা অনেকেই এখন বিভিন্ন স্বার্থে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
এ বিষয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দল ও সরকারকে আলাদা রাখতে হবে এবং সুবিধাবাদীদের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে হবে।
দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে যাদের ভূমিকা ছিল, অন্তত তাদের প্রতি ন্যূনতম মূল্যায়ন ও সম্মান দেখানো উচিত। তাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক নেতা ফোন পর্যন্ত ধরেন না, যা ত্যাগী কর্মীদের জন্য কষ্টদায়ক।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিতদের একটি অংশ উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন। এ বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে ভাবছে দল। একইভাবে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন না পাওয়া অনেক নারী নেত্রীও উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন চাইতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং এলাকায় যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে তিনি বলেন, অধিকাংশ সংগ্রামী নারী নেত্রী মূল্যায়ন পেয়েছেন, যদিও শতভাগ সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব হয় না।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় মো. জাহিদ নামে এক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কান্নাজড়িত সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, আগের কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জাহিদের প্রত্যাশা ছিল নতুন কমিটিতে শীর্ষ কোনো পদে জায়গা পাবেন। কিন্তু ১৮ সদস্যের নতুন কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থেকেও মূল্যায়ন পাননি এবং প্রকৃত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে সম্প্রতি বিএনপি ছেড়ে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিয়ে আলোচনায় আলোচনায় আসেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা এবং যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার তার দাবি, দলের একজন প্রভাবশালী নেতার দুর্ব্যবহার ও অবহেলার কারণেই তিনি দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, দলের আদর্শ ধারণ করেছি। কিন্তু যখন আমাদের সঙ্গে অবহেলা ও অসম্মানজনক আচরণ করা হয়, তখন সেটা মেনে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে দলীয় উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও আশানুরূপ সাড়া পাননি। এরপরই এনসিপিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ






