তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব পালন শেষে গত শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এই আলোচনা এখন সর্বত্র।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবে জাতীয় সংসদ। সে অনুযায়ী আগামী ২৪ অক্টোবরের মধ্যেই এর নিষ্পত্তি হবে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে আসছেন? ক্ষমতাসীন দল এই পদে কাকে মনোনয়ন দেবে-এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে জোর আলোচনা।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের পর এই পদে ঘুরে ফিরে আসছে বিএনপির পাঁচ জ্যেষ্ঠ নেতার নাম। তারা হলেন- দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান এবং বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সরকারি দলের কাছে রাষ্ট্রপতি পদ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এবার যিনি রাষ্ট্রপতি হবেন তিনি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সময় দায়িত্বে থাকবেন। ফলে এ বিষয়ে খুব ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে দলটি- এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, বিএনপি দলীয় নাকি বাইরের কেউ, তা দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে নির্ধারণ হবে। সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন মেনে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ । ফলে এ পদে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সক্ষমতার ওপর গুরুত্বারোপ করা উচিত।
আলোচনায় থাকা বিএনপির এই পাঁচ নেতার রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। আছে সংসদীয় রাজনীতি, দল পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতাও।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক ১৯৮০-এর দশকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর বিএনপির মহাসচিব হন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দলীয় আন্দোলন, নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুতে বিএনপির প্রধান মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন: ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন তিনি। এরপর ১৯৯১ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি চার দলীয় জোট সরকারের সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি বিএনপির নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
ড. আব্দুল মঈন খান: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। এরপর ১৯৯১ ও ২০০১ সালের বিএনপি সরকারের সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা, গণতন্ত্র, সুশাসন ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে দলের অন্যতম চিন্তাশীল নেতা হিসেবে পরিচিত তিনি।
নজরুল ইসলাম খান: ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। আছে শ্রমিক রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা। শ্রমিক অধিকার, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দীর্ঘদিন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য।
বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। সরকারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কর্মসূচি এবং দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করতে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন এই প্রবীণ রাজনীতিক। বর্তমানে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আলোচনায় থাকা বিএনপি পাঁচ জ্যেষ্ঠ নেতারই রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁরা মনোনয়ন পেলে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
তাঁদের মতে, দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রতীক হতে পারেন বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণে তিনি দলমত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পেলে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দিয়ে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সহায়ক হতে পারেন।
এ বিষয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হলে তা দল থেকেই জানানো হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদের জন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকেই বেছে নেওয়া ভালো। কারণ, তাদের রয়েছে সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা। যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে। যদিও এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে বসবে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন। এই অধিবেশনেই সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।
ভিওডি বাংলা/এফএ









মন্তব্য