মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: যে দুপুরে থেমে গিয়েছিল অসংখ্য ক্ষুদে স্বপ্ন

সেদিনও ছিল অন্য দিনের মতোই একটি স্কুলের দুপুর। শ্রেণিকক্ষে পাঠ চলছিল, করিডোরে ছিল শিশুদের কোলাহল, আর অভিভাবকদের কাছে সেটি ছিল আর দশটি দিনের মতোই। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের একটি দুর্ঘটনা সব হিসাব বদলে দেয়। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সেই মুহূর্ত শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, শোকস্তব্ধ করেছিল পুরো দেশকে।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭বিজিআই (FT-7BGI) প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভবনের একটি অংশে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যে শুরু হয় প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
যে দুপুরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশ
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ উদ্ধারকাজে অংশ নেন। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে একের পর এক পৌঁছাতে থাকে দগ্ধ ও আহতরা। হাসপাতালের করিডোরে শুরু হয় স্বজনদের উৎকণ্ঠার অপেক্ষা, আর স্কুল প্রাঙ্গণজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।
পরবর্তীতে সরকারি হিসাবে এই দুর্ঘটনায় ৩৭ জনের মৃত্য হয়। আহত হন ১৭৩ জন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বেসামরিক প্রাণহানির দিক থেকে অন্যতম ভয়াবহ সামরিক বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংখ্যার আড়ালে যে গল্পগুলো হারিয়ে যায়
দুর্ঘটনার পর নিহত ও আহতের সংখ্যা সংবাদ শিরোনামে এসেছে। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একটি পরিবার, একটি খালি হয়ে যাওয়া বেঞ্চ, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন।
কোনো বাবা-মা আর সন্তানের হাত ধরে বাড়ি ফিরতে পারেননি। কোনো সহপাঠী আজও বন্ধুর নাম ডাকার সময় থমকে যান। কোনো শিক্ষক হয়তো এখনো সেই দিনের আতঙ্ক ভুলতে পারেননি।
আগুনের মধ্যেও মানবতার আলো
সেদিন অনেকেই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন শিক্ষক, কর্মচারী, নিরাপত্তাকর্মী, ফায়ার সার্ভিস, সেনাসদস্য, চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী আগুনের মধ্যে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে গিয়ে গুরুতর দগ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার আত্মত্যাগ সেই দিনের মানবিক সাহসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
শুধু তদন্ত নয়, নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
দুর্ঘটনার পর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়। একই সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আকাশপথ, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়।
এক বছর পরও যে ক্ষত শুকায়নি
সময় এক বছর পেরিয়েছে। কিন্তু যেসব পরিবার তাদের সন্তান, স্বজন বা সহকর্মীকে হারিয়েছে, তাদের কাছে ক্যালেন্ডারের হিসাব খুব একটা বদলায়নি।
মাইলস্টোনের সেই দুপুর আজও মনে করিয়ে দেয়, কয়েক সেকেন্ডেই একটি জাতি শোকস্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। আর প্রতিটি ট্র্যাজেডি শুধু স্মরণ করার জন্য নয়, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন বেদনা বয়ে বেড়াতে না হয়, সেই শিক্ষা নেওয়ারও একটি সুযোগ।
২১ জুলাই তাই শুধু একটি দুর্ঘটনার দিন নয়। এটি অসংখ্য অসমাপ্ত স্বপ্ন, অপ্রকাশিত বিদায় এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জাতীয় অঙ্গীকারের দিন।
ভিওডি বাংলা/এমএস/বিন্দু








মন্তব্য