• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
logo

বিশ্লেষণ

হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র বানিয়ে কী পেল ইরান

  ভিওডি বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ:  ২৫ জুলাই ২০২৬, ১১:০৯ এ.এম.
শেয়ার করুন 0
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সময়ের সঙ্গে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু বদলে গেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে?

যদিও ছয় মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরুতে মূল আলোচনায় ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সামরিক সক্ষমতা এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ইরান সরাসরি প্রণালিটি বন্ধ না করলেও বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে আন্তর্জাতিক শিপিং কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বহু জাহাজ বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে, বীমা খরচ বেড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য শুধু সামরিক চাপ সৃষ্টি নয়; বরং এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করা, যেখানে হরমুজ দিয়ে কোন জাহাজ চলবে এবং কী শর্তে চলবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তেহরানের হাতে চলে আসে। যদি এমনটি ঘটে, তবে ইরান প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

ইরানের সুবিধা: 
ইরান এখনো প্রণালিটি শারীরিকভাবে অবরোধ করেনি। কিন্তু বেসামরিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে তারা এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে অনেক শিপিং কোম্পানি হরমুজ এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে।

এই কৌশল নতুন নয়। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা অতীতে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একই ধরনের হামলা চালিয়ে লোহিত সাগরের বাণিজ্য কার্যত অচল করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালিয়েও প্রতিটি হামলা ঠেকাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতার পরই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

হরমুজের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক নৌপথ নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের কেন্দ্র।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান কৌশল স্বল্পমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটিই তেহরানের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এখন হরমুজকে পাশ কাটিয়ে নতুন পাইপলাইন, বন্দর এবং জ্বালানি পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা।

গোল্ডম্যান স্যাকসের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে বিদ্যমান ও নতুন বিকল্প রুটগুলো হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বহনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

সৌদি আরব: দেশটি ইতোমধ্যে পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত একটি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করছে। বর্তমানে এটি দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। নতুন সম্প্রসারণ শেষ হলে সক্ষমতা ৯০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: হরমুজের দক্ষিণে বিদ্যমান পাইপলাইনের সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইরাক-সিরিয়া করিডোর: ইরাক ও সিরিয়ার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে তেল রপ্তানির পুরোনো অবকাঠামো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ চলছে। এতে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোরও বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে।

ইরাক-তুরস্ক পাইপলাইন: দীর্ঘদিন রাজনৈতিক জটিলতায় কার্যত অচল থাকা এই রুট আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইরাক-জর্ডান পাইপলাইন: বসরা থেকে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও দ্রুত এগোচ্ছে।

ইতিহাস কী বলছে?

বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতিতে এমন পরিবর্তন নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আজারবাইজান, জর্জিয়া ও তুরস্ক হয়ে নির্মিত বাকু-তিবিলিসি-জেইহান (BTC) পাইপলাইন রাশিয়ার ওপর ইউরোপের নির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোও একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করছে। তাদের লক্ষ্য, কোনো একটি জলপথ বা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

কী হতে পারে?

নতুন পাইপলাইন ও পরিবহন অবকাঠামো বাস্তবায়নে সময়, অর্থায়ন এবং নিরাপত্তাজনিত নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইরান চাইলে এসব প্রকল্পেও হামলা চালানোর চেষ্টা করতে পারে। তবুও আঞ্চলিক দেশগুলো এখন মনে করছে, হরমুজের ওপর একক নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। যদি পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো সফল হয়, তবে আগামী কয়েক বছরে হরমুজ প্রণালি এখনও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, তবে আগের মতো অপরিহার্য নাও থাকতে পারে।

অর্থাৎ, ইরান যে পথকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা করছে, সেই পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশগুলোকে এমন বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যতে তেহরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

সূত্র: সিএনএন

ভিওডি বাংলা/জা


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স
জেন-জি আন্দোলনের মধ্যেই মোদি সরকারের মন্ত্রীর পদত্যাগ
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। ছবি: সংগৃহীত
‘ককরোচ’ বিতর্কে ব্যাখ্যা দিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি ইরানের নতুন নেতা পরমাণু বোমা বানাতে বেশি আগ্রহী