• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

অনলাইনে ভুয়া তথ্যের বিস্তার, বাদ যাননি তারেক রহমানও

মেহেদী সৌরভ    ১৪ জুন ২০২৬, ০১:৩০ এ.এম.
ছবি: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) দিয়ে তৈরি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটি পরিচয়পত্রের ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন পরিচয়পত্র বলে দাবি করা হচ্ছে। ফেসবুকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে ছবিটি শেয়ার করে এটিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছাত্রজীবনের আসল (অরিজিনাল) আইডি কার্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে তথ্য-যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রচারিত পরিচয়পত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এতে থাকা একাধিক তথ্যও বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিলছে না।

বাংলাদেশে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের কত শতাংশ ভুয়া? এমন কোনো নির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন জরিপ ও ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে।

বলা যায়, আনুমানিক ২০১৮ সালে যখন দেশে ফোরজি (4G) প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় ঠিক তখনই ডিজিটাল পাড়ায় ভুয়া তথ্য, ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২০ সালের একটি জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার ফেক নিউজ বা ভুয়া তথ্যের মুখোমুখি হয়েছেন, যা অনলাইন তথ্য পরিবেশে বিভ্রান্তির বিস্তৃত উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২,৯১৯টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২,৩৩০টি কনটেন্ট ছড়িয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে- যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তথ্য প্রবাহের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে।

প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের দ্রুত বিস্তারের ধারাকে নির্দেশ করে।

সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিশ্লেষক জেনিফার আলম বলেন, গুজব মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে। গুজবের প্রতিকার সচেতনতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব। গুজব সাধারণত দুই ধরনের এক. বিনা স্বার্থে, অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে। যা কোনো অপরাধ বা অরাজকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয় না। দ্বিতীয়টি প্রথমটির বিপরীত, অপরাধ ও অরাজকতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই এসব গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে।

ভুয়া ছবিটিতে যা দেখা যাচ্ছে
ভাইরাল ছবিতে তারেক রহমানের ইংরেজি নাম লেখা হয়েছে “Tareque Rahman”। সেখানে বিভাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আইন বিভাগ, আবাসিক হল হিসেবে 'শহীদুল্লাহ হল', শিক্ষাবর্ষ হিসেবে ১৯৮৪-৮৫ এবং সেই ছবিতে জন্মতারিখ হিসেবে দেয়া আছে ২০ নভেম্বর ১৯৬৭।

অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে
প্রথমত, বিএনপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে তারেক রহমানের ইংরেজি নাম “Tarique Rahman” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ভাইরাল কার্ডে ব্যবহৃত বানানটির সঙ্গে সেটির মিল নেই।

দ্বিতীয়ত, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান ১৯৮৫-৮৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অধ্যয়ন করেন। এছাড়া তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলের শিক্ষার্থী ছিলেন। ফলে ভাইরাল কার্ডে উল্লেখিত শিক্ষাবর্ষ এবং আবাসিক হল দুই তথ্যই ভুল।

তৃতীয়ত, বিএনপির অফিসিয়াল জীবনী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের জন্মতারিখ ২০ নভেম্বর ১৯৬৫। অথচ ভাইরাল কার্ডে তা ২০ নভেম্বর ১৯৬৭ লেখা হয়েছে।

ছবির লোগোতেও অসঙ্গতি
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো মোট চারবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং সর্বশেষ পরিবর্তন হয় ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ভাইরাল পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত লোগোর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সময়ের আনুষ্ঠানিক লোগোর মিল পাওয়া যায়নি।

এআই তৈরির স্পষ্ট লক্ষণ
প্রচারিত ছবির সিল ও বিভিন্ন অংশে এমন কিছু বিকৃত ও অসংলগ্ন লেখা দেখা যায়, যা সাধারণত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) জেনারেটেড ছবিতে দেখা যায়। পরবর্তীতে হাইভ মডারেশনসহ একাধিক এআই ইমেজ-ডিটেকশন টুলে ছবিটি পরীক্ষা করে সেটিকে এআই দ্বারা তৈরি হওয়ার উচ্চ সম্ভাবনার ফলাফল পাওয়া গেছে।

কত শতাংশ তথ্য ভুয়া?
বাংলাদেশে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ঠিক কত শতাংশ ভুয়া? এমন কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০২০ সালের একটি জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দেশের ৬৪ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার ফেক নিউজের মুখোমুখি হয়েছেন। 

অন্যদিকে, ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশে ২,৯১৯টি ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২,৩৩০টিই ছড়িয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে। 

এছাড়া ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে শনাক্ত হওয়া ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে, যা অনলাইনে বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।

প্রধানমন্ত্রীর ভাইরাল ভুয়া আইডি কার্ড, যাচাইযোগ্য তথ্যগুলোর মধ্যে পাওয়া গেছে:

ইংরেজি নামের বানান: ভুল
শিক্ষাবর্ষ: ভুল
আবাসিক হল: ভুল
জন্মতারিখ: ভুল
বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো: অসত্য/অমিল
সিল ও টেক্সটের গঠন: এআই-সৃষ্টির ইঙ্গিত
ছবির উৎস ও সত্যতা: প্রমাণিত নয়

যাচাইযোগ্য মূল উপাদানগুলোর প্রায় সবকটিতেই অসঙ্গতি বা ভুল তথ্য পাওয়া গেছে। সে হিসেবে ফটোকার্ডটিকে প্রায় শতভাগ ভুয়া ও কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
এই ঘটনা কেবল একটি ভুয়া ছবি ঘিরে বিতর্ক নয়। বরং রাজনৈতিক নেতাদের অতীত পরিচয়, ব্যক্তিগত ইতিহাস কিংবা রাজনৈতিক বয়ানকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল যুগে ‘ন্যারেটিভ নির্মাণ’ এবং ‘ন্যারেটিভ প্রতিযোগিতা’ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ এটি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সহজলভ্যতা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ঘিরে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সুযোগ বাড়িয়েছে। ফলে কোনো ছবি বা নথি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার আগে তার উৎস, প্রেক্ষাপট ও তথ্যগত সত্যতা যাচাই করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফ্যাক্ট চেক রেটিং: সম্পূর্ণ ভুয়া
যাচাইয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র দাবিতে প্রচারিত ছবিটি আসল নয়। এটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এবং এতে একাধিক তথ্যগত ভুল ও বিভ্রান্তিকর উপাদান রয়েছে।

মতপ্রকাশে সীমারেখা
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক রাইয়ান মালিক বলেন, ইন্টারনেটে পাওয়া যেকোনো তথ্য যেমন বিশ্বাস করা যাবে না, তেমনি যাচাই-বাছাই ছাড়া এগুলো শেয়ার করাও যাবে না। গুজব প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য মানুষের সচেতনতা ও সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি।

অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছায় নানা ভুল তথ্য, ছবি, ভিডিও এবং গুজব ছড়ানো হচ্ছে। মতপ্রকাশের অধিকার আছে সবার, কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা ছড়িয়ে দেওয়া নয়। দেশের আইন মেনে চলতে হবে সবাইকে।

ভিওডি বাংলা/এমএস/আরআর/এফএ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
২০ বছর পর খুলেছে বাংলা ভাইয়ের মাদ্রাসা
২০ বছর পর খুলেছে বাংলা ভাইয়ের মাদ্রাসা
প্রথমবার এমপি হয়েই চমক, আলোচনায় ইশরাকের ১০০ দিনের অর্জন ও পরিকল্পনা
প্রথমবার এমপি হয়েই চমক, আলোচনায় ইশরাকের ১০০ দিনের অর্জন ও পরিকল্পনা
ভারত-চীন জল্পনা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া
ভারত-চীন জল্পনা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া