ভারত-চীন জল্পনা পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গন্তব্য মালয়েশিয়া

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে গত কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে ছিল ব্যাপক আলোচনা। বিভিন্ন সময়ে ভারত, ভুটান, নেপাল, চীন, সৌদি আরব এবং মালয়েশিয়ার নাম সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নাম চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে ভারতকে প্রথম সফরের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভারতকে ‘স্বাভাবিক কূটনৈতিক পছন্দ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
একই সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল, প্রথম সফরটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী কোনো ছোট রাষ্ট্র দিয়ে শুরু করা যায় কি না। সে ক্ষেত্রে ভুটানের নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আসে। সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে ভুটানে প্রথম সফর বাংলাদেশের প্রতিবেশীকেন্দ্রিক কূটনীতির ইতিবাচক বার্তা দেবে এমন যুক্তিও আলোচনায় ছিল। কিছু কূটনৈতিক মহলে নেপালের নামও অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হয়, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
অন্যদিকে, এপ্রিল মাস থেকে চীন সরকার তারেক রহমানকে বেইজিং সফরের জন্য আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। মে মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফর আলোচনায় আসে। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র ঢাকায় পৌঁছায়। জুনের শেষ সপ্তাহে সম্ভাব্য চীন সফর নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতি সফরের মূল আলোচ্য হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সরকার গঠনের পর আরেকটি সম্ভাব্য গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল, ওমরাহ পালন এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের অংশ হিসেবে তারেক রহমান প্রথম সফরে সৌদি আরব যেতে পারেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের কারণে সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
এদিকে, ভারত ও চীনের আমন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নটি সরকারের জন্য বড় কূটনৈতিক বিবেচনায় পরিণত হয়। নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা ছিল, প্রথম সফর যদি দিল্লি বা বেইজিংয়ে হয়, তাহলে সেটি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। ফলে তৃতীয় কোনো বন্ধুরাষ্ট্রকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার চিন্তা গুরুত্ব পায়।
এই প্রেক্ষাপটে সামনে আসে মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম নির্বাচনের পরপরই তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। পরে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ২১-২২ জুন কুয়ালালামপুর সফরের আমন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। সরকারও সেই আমন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
সূত্রমতে, মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া বাংলাদেশের ‘ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি’র প্রতিফলন। এর মাধ্যমে ঢাকা একদিকে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার মধ্যে নিরপেক্ষ অবস্থানের বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারের পথ খুলছে।
তবে মালয়েশিয়া সফর চূড়ান্ত হলেও ভারত ও চীন সফরের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, মালয়েশিয়া সফরের পর দিল্লি ও বেইজিং দুই রাজধানীতেই প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ঘিরে আলোচনায় ভারত, ভুটান, নেপাল, সৌদি আরব, চীন ও মালয়েশিয়ার নাম উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়াই প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য হিসেবে এগিয়ে এসেছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষাও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পুরোনো সম্পর্ক
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবেও একাধিকবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন।
প্রথমবার তিনি ২০০৩ সালে মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর ২০০৫ সালে আবারও দেশটি সফর করেন। সে সময় তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন এবং দেশে বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
এরপর লন্ডনে অবস্থানকালে ২০১৪ সালের ২ জুন মালয়েশিয়া সফর করেন তারেক রহমান। সে সময় তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সময়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সূত্রমতে, এবার ২০২৬ সালের ২১ জুন মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন তিনি বিএনপি চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এটিই হবে তাঁর প্রথম সরকারি বিদেশ সফর, যা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক বিবেচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ভিওডি বাংলাকে জানান, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পর এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ বাংলাদেশি শ্রমজীবী কর্মী বৈধভাবে কাজ করছেন। এখনো লাখ লাখ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ফলে এ খাতে অনেক ক্ষতি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।”
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মালয়েশিয়ার পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও আবহাওয়া পছন্দ করেন।
২১ জুনের এই সফরের মাধ্যমে শুধু নতুন সরকারের প্রথম বিদেশ সফরের অধ্যায়ই শুরু হচ্ছে না, একই সঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসছে।
ভিওডি বাংলা/এএইচ/এমএস







