জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের নতুন ভিশন

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধুমাত্র ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মমুখী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
রোববার (৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মাহদী আমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কাঠামো। এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের প্রায় সব অঞ্চলে বিস্তৃত জ্ঞানচর্চার একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের লক্ষ্য হলো শিক্ষাকে কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনের দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা।
উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষম ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তিনি জানান, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদার, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপের সুযোগ বৃদ্ধি, এবং ভাষা শিক্ষা উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এবং চাকরি সংযোগ (জব প্লেসমেন্ট) কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাহদী আমিন তার বক্তব্যে জানান, শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের জন্য বেশ কিছু নতুন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” উদ্যোগ, “এক শিক্ষার্থী, এক গাছ” কর্মসূচি,
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা প্রকল্প ও মাঠপর্যায়ে খাল খননসহ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ।
এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তক নির্ভর না রেখে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করা।
তিনি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিনের সেশনজট। এটি নিরসনে সরকার দ্রুতগতিতে কাজ করছে।
পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, ফল প্রকাশ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে আরও গতিশীল করা হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা দ্রুত সময়ে তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবে এবং কর্মজীবনে প্রবেশ সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রশিক্ষিত শিক্ষক। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক পদ্ধতি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষকদের জন্য অপরিহার্য।
মাহদী আমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় উচ্চশিক্ষা কাঠামো।
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়ে বের হয়। তবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই চাকরি পেতে সমস্যায় পড়ে।
তিনি বলেন, এই বাস্তবতা পরিবর্তন করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুললে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।
তিনি আরও জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবছর লাখ লাখ ছাত্রী বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হচ্ছে, যা নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
মাহদী আমিন বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; বরং এটি সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা একটি বিকেন্দ্রীভূত শিক্ষা কাঠামো। গ্রাম, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমে এটি দেশের বৃহত্তম শিক্ষাব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এই বিস্তৃত কাঠামোই দেশের সাধারণ মানুষের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগকে সহজ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, মানবিক ও সামাজিক গুণাবলিও অর্জন করতে হবে। এ জন্য বিতর্ক, বিজ্ঞানমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্যচর্চা এবং খেলাধুলার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা হবে।
প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, অনেক দেশেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একইভাবে উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/জা







