আদালতে হাজির সোহেল-স্বপ্না

সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেওয়া শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় রোববার (৭ জুন) ঘোষণা করা হবে। এ লক্ষ্যে মামলার দুই অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আদালতে হাজির করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে সকাল ১০টার পর রায় ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচিত এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আট বছর বয়সী রামিসা আক্তার নির্মম নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন পর্যন্ত সর্বত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে দেশব্যাপী।
শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় সরকারও দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় মামলাটির তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম অল্প সময়ের মধ্যেই এগিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। একই সময়ে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আটক করা হয়।
পরদিন নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়।
ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।
পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়।
গত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। পরদিন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়।
সাক্ষীদের মধ্যে নিহত শিশুর স্বজন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। তাদের সাক্ষ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অপরদিকে স্বপ্না আক্তারও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
গত ৪ জুন অনুষ্ঠিত যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, মামলায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, আলামত ও বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে।
রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ধারাবাহিকতা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এজন্য দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে দাবি করেন, মামলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উপস্থাপন করা হয়নি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ডিএনএ প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপিত হয়নি, ঘটনাস্থল থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং কোনো সিসিটিভি ফুটেজও নেই। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তিনি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে দাবি করেন।
একই সঙ্গে সোহেল রানার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
তদন্ত শুরু থেকে রায় ঘোষণার পর্যায় পর্যন্ত পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লেগেছে মাত্র ১৭ দিন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে এত অল্প সময়ে তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার নজির খুব কম দেখা গেছে।
ভিওডি বাংলা/জা







