তৃণমূল কংগ্রেসের সব কমিটি ভেঙে দিলেন মমতা

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান ও সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় অস্থিরতা, বিধায়কদের প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং সাংগঠনিক সংকটের মধ্যেই রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সব কমিটি ও শাখা সংগঠন বিলুপ্ত করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দলটির এক পোস্টে জানানো হয়, দীর্ঘ পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের পর পশ্চিমবঙ্গে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের অধীন সব সাংগঠনিক কমিটি এবং শাখা সংগঠন অবিলম্বে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গে দলটির বিদ্যমান সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো সাংগঠনিক পদাধিকারীও থাকছেন না।
গত কয়েক দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো আলোচনা চলছিল—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেস কি ভাঙনের পথে? সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নকে আরও উসকে দিয়েছে।
৩১ মে কলকাতার কালীঘাটে নিজ বাসভবনে তৃণমূলের বিধায়কদের নিয়ে বৈঠকের ডাক দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ১৭ জন উপস্থিত হওয়ায় বৈঠকটি কার্যত ভেস্তে যায়।
এর একদিন পর, ১ জুন কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চল, ব্লক ও ওয়ার্ডে দলীয় মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও মাঠে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম।
সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় ২ জুন। সেদিন কলকাতার ওয়াই চ্যানেলে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন মাত্র আটজন বিধায়ক ও ছয়জন সাংসদ। তবে তারাও পুরো সময় কর্মসূচিতে অবস্থান করেননি।
বুধবার বিধানসভায় পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা করার দাবিতে ৫৮ জন বিধায়ক স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে একটি চিঠি জমা দেন।
চিঠিতে দাবি করা হয়, তৃণমূলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন তাঁদের পক্ষে রয়েছেন। সে কারণে তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে সাবিনা ইয়াসমিন, কানাইয়ালাল আগরওয়াল, রথীন ঘোষ, শিউলি সাহা, আখরুজ্জামানসহ আরও অনেক বিধায়ক ছিলেন। পরে তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে জানান, বর্তমান নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁদের মতবিরোধ রয়েছে এবং এ বিষয়ে তাঁরা প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছেন।
একই দিনে ওই ৫৮ জন বিধায়ক নিজেদের ‘নতুন তৃণমূল কংগ্রেস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তাঁদের দাবি, ভবিষ্যতে বিধানসভায় বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে তাঁদের এই অংশ, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল তৃণমূল কংগ্রেস নয়।
নতুন শিবিরের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সামনে আনা হয়েছে। একসময় সিপিআই(এম)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ঋতব্রত পরে তৃণমূলে যোগ দেন এবং সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হন।
তবে ঘটনাটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া চিঠিতে নতুন তৃণমূলও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলীয় নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে সত্যিই ৫৮ জন বিধায়ক নতুন শিবিরে রয়েছেন কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু। নতুন তৃণমূলকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না, কিংবা কোন বিধায়ক কোন শিবিরের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন—সেসব প্রশ্নও এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
জানা গেছে, পুরো বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে স্পিকার সময় নিয়েছেন। এদিকে নতুন শিবির ইতোমধ্যে চারজনকে বিরোধীদলীয় নেতার উপনেতা হিসেবে মনোনয়নের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিধানসভা সেই প্রস্তাব অনুমোদন করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও তৃণমূলের মুখপাত্র কুনাল ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা এক বৈঠকে অংশ নিতে তাঁর দপ্তরে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহল বৈঠকটিকেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া
ভিওডি বাংলা/এমএস







