ভরা মৌসুমে ও ইলিশ সংকট

বর্ষা মৌসুমের আনুষ্ঠানিক সূচনার আগেই দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে ইলিশের উপস্থিতি বাড়ার কথা থাকলেও এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। বরিশালের নদীগুলোতে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ ধরা না পড়ায় বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট। এর প্রভাব পড়েছে দামে, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দেশের জনপ্রিয় এই মাছ।
মঙ্গলবার (২ জুন) সকালে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড মৎস্য মোকাম ঘুরে দেখা যায়, অন্যান্য বছরের তুলনায় বাজারে ইলিশের সরবরাহ অনেক কম। ব্যবসায়ীরা জানান, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৫০ থেকে ৬০ মণ ইলিশ বাজারে এসেছে। অথচ সাধারণত এ সময় প্রতিদিন কয়েকশ মণ ইলিশের আমদানি হয়ে থাকে।
সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ইলিশের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। এক কেজির বেশি ওজনের মাছ বাজারে খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। দু-একটি পাওয়া গেলেও সেগুলোর খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে।
এ ছাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা কেজি দরে। তুলনামূলক ছোট আকারের ইলিশ কিনতেও ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে দেড় হাজার টাকার বেশি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। জুনে এসে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ মণ মাছ ওঠে। কিন্তু চলতি বছরে সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না। তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে।
মাছ বিক্রেতা মো. আলম বলেন, জাটকা সংরক্ষণে সরকার ও মৎস্য বিভাগের নানা কর্মসূচি থাকলেও বাজারে তার প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। নদীতে মাছের উপস্থিতি খুবই কম। যে সময়ে কয়েকশ মণ ইলিশ বাজারে আসার কথা, সেখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ মণের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।
পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মালিক সমিতির সদস্য ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, কয়েক বছর আগে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে দেড় হাজার মণ পর্যন্ত ইলিশ আড়তে আসত। বর্তমানে ভরা মৌসুমেও ১ হাজার মণের বেশি মাছ পাওয়া যায় না। ফলে এক সময়ের কোটি টাকার ব্যবসা এখন কয়েক লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
ইলিশের উচ্চমূল্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারাও। মেয়ের আবদারে মাছ কিনতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাগর ভৌমিক জানান, তিনি ৯০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ২ হাজার টাকা কেজি দরে কিনেছেন। তার মতে, বর্তমান বাজারদরে সাধারণ মানুষের পক্ষে নিয়মিত ইলিশ কেনা কঠিন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান মো. মারুফ হোসেন। তিনি বলেন, পাইকারি বাজারে তুলনামূলক কম দামে মাছ পাওয়া যাবে ভেবে এসেছিলেন। কিন্তু এখানেও দাম অনেক বেশি হওয়ায় প্রয়োজনের তুলনায় কম মাছ কিনতে হয়েছে।
শুধু ক্রেতা নয়, সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলেদের জীবনেও। নদীতে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় আয় কমে গেছে তাদের। মেঘনা নদীতে মাছ ধরা জেলে সুমন মাঝি বলেন, মৌসুম শুরুর আগে সাধারণত নদীতে ইলিশের চলাচল বাড়ে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ছে না। ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য আড়ত সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদারও একই চিত্র তুলে ধরে বলেন, শুধু নদী নয়, সাগরেও প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ মিলছে না। গত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে বাজারে ইলিশের সরবরাহ অনেক কম।
তবে পরিস্থিতি নিয়ে এখনই উদ্বেগের কিছু দেখছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, প্রকৃত ইলিশ মৌসুম শুরু হবে জুলাই মাস থেকে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে সাগর থেকে বড় আকারের ইলিশ নদীতে প্রবেশ করবে এবং তখন বাজারে সরবরাহ বাড়বে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, চলতি বছর জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অভয়াশ্রমগুলোতে কঠোর নজরদারির কারণে বিপুলসংখ্যক জাটকা নিরাপদে সাগরে পৌঁছাতে পেরেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব মৌসুমের শেষভাগে পাওয়া যেতে পারে।
ভিওডি বাংলা/জা







