• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

যেভাবে প্রথম সপ্তাহ কাটলো মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক    ২২ মে ২০২৬, ০৬:৫০ এ.এম.
ছবি : সংগৃহীত

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সপ্তাহে একের পর এক বিতর্ক ও সরকারি আদেশ দ্রুত প্রত্যাহারের ঘটনায় আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা থালাপতি বিজয়। তার নতুন দল টিভিকে নেতৃত্বাধীন সরকারের এই শুরুটা কি কেবলই প্রথম সপ্তাহের জড়তা, নাকি রাজনীতিতে আনকোরা একটি দলের প্রচারের আলো, শাসনভার ও জোটের টানাপোড়েন সামলানোর ব্যর্থতা, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের প্রথম সপ্তাহের শাসনকাল তার সিনেমার মতোই নাটকীয় মোড় ও টুইস্টে ভরপুর ছিল। নিজের জ্যোতিষীকে বিশেষ কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আবার তা বাতিল করা, সচিবালয়ে ‘রিল কালচার’ শুরুর অভিযোগ এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সরকারি দরপত্র (টেন্ডার) প্রত্যাহারের মতো ঘটনা বিজয়ের প্রথম সপ্তাহের প্রথম ঝলকটিকে উচ্চমাত্রার নাটকীয় ও বিশৃঙ্খল করে তুলেছে। একে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব বলা হোক কিংবা সরকারের টিকে থাকার জন্য সহযোগীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার, বিজয় সরকারের জন্য শুরুটা যে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছিল, তা বলাই বাহুল্য। অথচ সুশাসনের একরাশ সাহসী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন এই সুপারস্টার।

বিজয়ের অগ্নিপরীক্ষা ও জ্যোতিষী বিতর্ক
বাস্তব রাজনীতির স্বাদ বিজয় কার্যভার নেওয়ার ঠিক পরদিনই পেয়ে যান। নিজের ব্যক্তিগত জ্যোতিষী রাধান পন্ডিতকে ওএসডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে তীব্র ঝড় ওঠে। এমন পরিস্থিতির পূর্বাভাস হয়তো বিজয় কিংবা তার জ্যোতিষী নিজেও পাননি। বিজয়ের এই প্রথম পদক্ষেপটি এতটাই সমালোচনার জন্ম দেয় যে মাত্র এক দিনের মাথায় তিনি আদেশটি বাতিল করতে বাধ্য হন। এমনকি টিভিকে সরকারের আস্থা ভোটের সময় এবং নিজস্ব জোটসঙ্গী কংগ্রেস, ভিসিকে ও বাম দলগুলোর কাছ থেকেও এই সিদ্ধান্তের জন্য বিজয়কে সমালোচনা শুনতে হয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে জ্যোতিষী এবং রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অবশ্য নতুন কিছু নয়। তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এমজিআর এবং জয়ললিতাও জ্যোতিষশাস্ত্রের বড় ভক্ত ছিলেন। কিন্তু বিজয় এমন এক জায়গায় হাত দিয়েছেন, যেখানে আগে কেউ সাহস দেখায়নি, নিজের ব্যক্তিগত জ্যোতিষীকে সরকারি পদে বসানো। এর ফলে করদাতাদের টাকায় অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারকে বিজয় ‘বৈধতা’ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এই সমালোচনার পাশাপাশি বিরোধী দল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নতুন রাজনীতিকের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে জনসমালোচনার মুখে পড়ে বিজয় যেভাবে দ্রুত তার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছেন, তা তার সাহসিকতাকেও প্রকাশ করে। যা বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে খুব কমই দেখা যায়। তা সত্ত্বেও, সুপারস্টারের শুরুর এই দৃশ্যপটটি ভালো বার্তা দেয়নি।

দরপত্র বিতর্ক ও জোটের চাপ
তবে বিজয়ের জন্য এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় কাঞ্চিপুরামের একটি পানির ট্যাংকের সরকারি দরপত্রকে কেন্দ্র করে। দরপত্রটি কোনও সমস্যা ছিল না, কিন্তু ঠিকাদারদের আবেদন জমা দেওয়ার জন্য মাত্র ছয় ঘণ্টার যে অবাস্তব সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেটিই বিতর্কের জন্ম দেয়।

এই অস্বাভাবিক সময়সীমার তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দল ডিএমকে অভিযোগ করেছে যে, একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই পুরো প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছিল। ডিএমকে-এর সিনিয়র নেতা আমুথারাসান এক টুইট বার্তায় বলেন, ‘এটি প্রশাসনিক গতি নয়... এটি পূর্বপরিকল্পিত ঠিকাদারি রাজনীতি!’

এখানে টিভিকে সরকার ‘অভিজ্ঞতার অভাব’-এর অজুহাত দিয়ে পার পাবে না। কারণ দরপত্রটি ইস্যু করেছিল পল্লী উন্নয়ন দফতর, যার দায়িত্বে রয়েছেন বিজয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের একজন বুসি আনন্দ। আনন্দ কিন্তু রাজনীতিতে নতুন নন, ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পুদুচেরির বুসি নির্বাচনি এলাকার বিধায়ক (এমএলএ) হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তার রয়েছে এবং সেই এলাকার নামেই তার এই নামকরণ।

এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারি আদেশ প্রত্যাহারের এই ঘটনা প্রশ্ন তুলেছে যে, বিজয় কি বিরোধীদের সমালোচনার মুখে ভেঙে পড়ছেন নাকি তিনি সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে মরিয়া?

বাস্তবতা হলো, জোটের সমীকরণ বিজয়কে খুব বেশি নড়াচড়া করার সুযোগ দিচ্ছে না। বিধানসভায় টিভিকে-এর ১০৭ জন বিধায়ক রয়েছেন এবং সরকার চালানোর জন্য তাদের ছোট ছোট সহযোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যাদের অধিকাংশই এখনও ডিএমকে-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন পর্দার আড়াল থেকে টিভিকে সরকারের সুতো নাড়াতে পারেন, যা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু বিজয় যদি একের পর এক আদেশ এভাবে প্রত্যাহার করতে থাকেন, তবে তা তার শাসনে অন্যদের হস্তক্ষেপেরই ইঙ্গিত দেয়।

বিজয় সরকারের আরও কিছু হোঁচট
ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে বিজয় সরকারকে আরও কিছু ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিজয় আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ২০০ ইউনিট বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রকল্পের ঘোষণা দেন। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে যে শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হবে, তা তিনি আগে বলেননি। সরকার জানিয়েছে, দুই মাসের বিলিং চক্রে যেসব পরিবার সর্বোচ্চ ৫০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, কেবল তারাই এই স্কিমের আওতায় আসবে।

টিভিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গ্রাহকেরা এক ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই বিধিনিষেধের জন্য বিজয়ের সমালোচনা করেছেন। তবে বিজয় রাজ্যের ১০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝার কথা উল্লেখ করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন। গত সপ্তাহে আগের ডিএমকে সরকারকে খোঁচা দিয়ে বিজয় বলেন, ‘কোষাগার সম্পূর্ণ খালি করে দেওয়া হয়েছে, যা একটি অসহনীয় বোঝা রেখে গেছে।’

এখানেই শেষ নয়, নিন্দুকেরা টিভিকে সরকারের ভেতরে ‘রিল কালচার’ সংস্কৃতির দিকেও আঙুল তুলেছেন। তামিলনাড়ু সচিবালয়ে প্রতিবন্ধী অধিকার গোষ্ঠীর সঙ্গে বিজয়ের মতবিনিময়ের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এই বিতর্ক শুরু হয়। প্রথমে অভিযোগ উঠেছিল যে কোনও সরকারি কর্মকর্তা ভিডিওটি রেকর্ড করে ‘রিল’ হিসেবে আপলোড করেছেন। 

পরে টিভিকে-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয় যে, বিজয়ের অনুমতি নিয়েই এক প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মী ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও, সরকারি বৈঠকগুলোকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও অন্য একটি পক্ষ একে সাধারণ মানুষের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর পৌঁছানোর সহজ মাধ্যম হিসেবেই দেখছেন।
ভিওডি বাংলা/এসআর

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
পাকিস্তানে অভিযানে শীর্ষ কমান্ডারসহ নিহত ২৩ জঙ্গি
পাকিস্তানে অভিযানে শীর্ষ কমান্ডারসহ নিহত ২৩ জঙ্গি
মহারাষ্ট্রে বাঘের হামলায় নিহত ৪ নারী
মহারাষ্ট্রে বাঘের হামলায় নিহত ৪ নারী
ফের সিরিয়ায় হামলা চালাল ইসরায়েল
ফের সিরিয়ায় হামলা চালাল ইসরায়েল