বইগুলো সব ফুল হয়ে ফুটুক

খান মুহাম্মদ রুমেল
ফেব্রুয়ারি প্রথম দিনের বিকেল। সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে টিসএসসির কোলজুড়ে বহু মানুষের ভিড়। চায়ের কাপে ঝড়। ফুলওয়ালী কিশোরির রিনরিনে গলার আওয়াজ— একটা মালা নিবেন আফা? নেন না একটা মালা! জ্যামে আটকে পড়া গাড়ি এক্সিলেটরে ঘণঘণ চাপ দেয়— ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তোলে— মনেহয় খাটো দড়িতে বাঁধা খ্যাপা লাল ষাড় বাঁধন মুক্ত হতে চাইছে। আছে রিকশাচালকদের খিস্তি খেউর। রংতুলি হাতে এদিক ফুটপাথ ধরে হাঁটেন কৈশোর পেরোনো কয়েকজন তরুনী। মাথায় ফুলের ঝাপি। তাদের পেছন পেছন দুজন লাজুক তরুণ। তরুণ তরুনীর দল কি একে অপরের কেউ হয়? প্রশ্ন মনে জাগরুক রেখেই টিসএসসির গেট দিয়ে ঢুকে পড়ি মেলায়। প্রবেশ মুখে এদিন পুলিশের উপস্থিতি নেই। নিরাপত্তা তল্লাশি নেই। মানুষ নিজের মতো ঢুকছেন। খুব বেশি ভিড় নেই বলে বিশৃঙ্খলাও নেই। অমর একুশে বইমেলা ২০১৫ উদ্বোধন হয়ে গেলো একটু আগে। তারপর পর থেকেই খুলে দেয়া হয়েছে মেলা চত্বর সাধারণ মানুষের জন্য। গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে পেনসিল স্কেচ আঁকিয়েদের ভিড়। প্রতিবছর মেলার একমাস এখানটায় বসে থাকেন তারা। তাৎক্ষণিক ছবি এঁকে দেন আগ্রহী মানুষের— অবশ্যই টাকার বিনিময়ে। তাদের সামনে অল্প কিছু মানুষের ভিড়। আগেই বলেছি প্রথমদিনের মেলায় স্বাভাবিক নিয়মেই ভিড় নেই খুব বেশি। যদিও শনিবার— সাপ্তাহিক ছুটির দিন উপলক্ষ্যে ভিড়টা আরেকটু বেশি হতেই পারতো। তবে সপ্তাহ পেরোনোর আগেই এই ভিড় আরো অনেকটা বাড়বে— নিশ্চিত।
এবার অনেকটা হুট করেই নগর থেকে বিদায় নিলো শীত। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই মেলার মাঠে বসন্তের হু হু হাওয়া। গেটের পেরোনোর পরেই বিশাল রেইনট্রি গাছটা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাই। হাতের বাঁয়ে বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রটা তৈরি হয়নি তখনো। উল্টোপাশের বাংলা একাডেমির নিজেদের বই বিক্রির স্টলও তখন পর্যন্ত অপ্রস্তুত। বাতিহীন স্টলে বই গুছিয়ে রাখছেন বিক্রয় কর্মীরা। সামনের দিকে এগিয়ে যাই। ছোট ছোট দল বেঁধে হাঁটছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে তারুন্যের সংখ্যাই বেশি। দক্ষিণ দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে মুক্ত মঞ্চের সামনে দাঁড়াই। প্রস্তুত হয়ে গেছে বেশিরভাগ স্টল প্যাভিলিয়ন। তবে কিছু স্টলে এখনো নির্মাণ কাজ চলছে— যেমনটা হয়ে থাকে প্রতিবছর। সময় সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সবাই স্টল প্রস্তুত করে উঠতে পারেন না। এবারও ব্যতিক্রম নয়। মুক্তমঞ্চের সামনে থেকে পূব দিকে চোখ মেললে চোখে ধরা দেয় পুরো মেলা। হাঁটতে থাকি ধীর পায়ে। কোনো তাড়া নেই। কাউকে খোঁজা নেই। সন্ধ্যা মিলিয়েছে কেবল। জ্বলে উঠেছে স্টলগুলোর বিজলিবাতি। যারা এদিন মেলায় এসেছেন— বেশিরভাগই ঘুরেফিরে দেখছেন। প্রথমদিনে বই কেনার তাড়া নেই কারো। বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীরা হেঁটে চলা মানুষের দিকে তাকিয়ে আছেন আগ্রহ ভরে। কোথাও কোথাও বিক্রয়কর্মীরা নিজেদের মধ্যে আডডায় মশগুল।
প্রথমদিনে বেশকিছু শিশু কিশোরের দেখা মেলে হেঁটে চলার পথে। বাবা মায়ের হাত ধরে হাঁটছে তারা। কলকল কথার স্রোত বইছে তাদের মুখে। এদের প্রায় সবার হাতে বইয়ের প্যাকেট। বোঝা যায় মেলার প্রথমদিনের ক্রেতারা বেশিরভাগই শিশু কিশোর।পুরো মেলা চত্বর একদফা চক্কর দিয়ে থিতু হই। চা কফির খোঁজ করি। অন্যবারের মতো এবারও মেলা প্রান্তরে চায়ের কোনো আয়োজন নেই। মেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এবারও কোনায় কোনায় কর্পোরেট কফির দোকান। তবে সেগুলোও বেশিরভাগ বন্ধ। চা পাগল লেখক পাঠক দর্শনার্থীর কথা এবারও বিবেচনায় নেই! অথচ প্রতিবছরই এনিয়ে খেদ ঝাড়েন মেলার মানুষেরা।
ইত্যাদি প্রকাশের সামনে চোখে পড়ে লেখক গণমাধমকর্মীদের ছোট্ট আড্ডা। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখি। কাছে যাবো কি না ভাবছি— এমন সময় উঁচু গলায় ডেকে উঠেন একজন। তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আড্ডায় সময় কাটে। খানিক বাদে চোখে পড়ে সস্ত্রীক হেঁটে যাচ্ছেন সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ। কবি কথা সাহিতি্যক, সমালোচক, টকশোর তুখোড় আলোচক নানা পরিচয় তার। এসবের আড়ালি তার চিকিৎসক পরিচয় ঢাকা পড়ে যায় মাঝে মাঝে। সহাস্য কুশল বিনিময় শেষে সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ জানতে চান — অনন্যা প্রকাশনীর স্টলটা কোন দিকে? হাত দিয়ে ডান কোণার দিকে নির্দেশ করেন একজন। চলে যান তিনি। আড্ডায় মন বসে না। আবার হাঁটতে থাকি। হেঁটে হেঁটে আবারও দেখা হয়ে যায় সাখাওয়াত সায়ন্থ’র সঙ্গে। বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন তিনি। এখান থেকে বের হয়েছে তার উপন্যাস নিঃসঙ্গ সত্য। বইটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখি। ফ্ল্যাপে সায়ন্থ লিখেছেন— কিছু সত্য থাকে যা কাউকে বলা যায় না। মনের মধ্যে সেই গোপন নিঃসঙ্গ সত্যটা কখনো নাড়া দিয়ে উঠে। তা প্রকাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে মন।
এগিয়ে যাই তার দিকে। প্রশ্ন রাখি— সত্য কেন নিঃসঙ্গ ? হেসে উঠেন সাখাওয়াৎ সায়ন্থ। বলেন— কিছু সত্য থাকে যা কখনো কাউকে বলা যায় না। সেই দিক বিবেচণা করলে কিছু সত্য নিঃসঙ্গ থেকে যায় সব সময়। যেমন আমার এই বইয়ের প্রধান চরিত্র সাফওয়ানের একটা সত্য আছে, যেটা কাউকে বলা যায় না। কিন্তু আবার বলার জন্য মনে আকুলি বিকুলি চলে। এক সময় সে তার গোপন সত্যটা একজনকে বলে ফেলে ভার মুক্ত হওয়ার আশায়। পরে সাফওয়ানের মনে হয় সত্যটা প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এক পর্যায়ে সেই লোককে খুন করে সাফওয়ান। পরে ভীষণ আত্মদহন থেকে এক সময় সে নিজেও আত্মহত্যা করে।
— এটা কি থ্রিলার? প্রশ্ন করি আমি।
— নাহ, থ্রিলার নয়। এটি একটি নিটোল প্রেমের কাহিনি। যার শেষটা বিয়োগান্তক।
আমি আবার চোখ রাখি বইয়ে। ফ্ল্যাপের শেষ অংশে সায়ন্থ লিখেছেন— ভালোবাসা হারানোর হতাশায় আচ্ছন্ন একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন হন্তারক এবং শেষ পর্যন্ত আত্মবিধ্বংসী, সেই মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক গল্পের হয়তো পাঠককে আলোড়িত করবে।
আমাদের কথার মাঝখানেই হাজির হোন সায়ন্থের বেশকয়েকজন বন্ধু। তাদের আড্ডার সুযোগ করে দিয়ে বিদায় নিই। হাঁটতে হাঁটতে মুক্তমঞ্চের সামনের পাচিলে বসে থাকি কিছু্ক্ষণ। মেলায় এখনো মানুষ ঢুকছেন দলে দলে। আর আমি ধীর পায়ে বের হয়ে আসি মেলা থেকে। ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলি শাহবাগ মুখি। আরামদায়ক শীতে একা একা হাঁটতে বড় ভালো লাগে।
ভিওডি বাংলা/এম







