ক্যামেরায় ধরা পড়েনি দিল্লির যে গল্প

দিল্লির কেন্দ্রস্থল সোমবার যেন পরিণত হয়েছিল ব্যানার, স্লোগান আর তরুণদের ঢলে উত্তাল এক জনসমুদ্রে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় ভরে ওঠে। এনইইটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে অনুষ্ঠিত 'চলো সংসদ' কর্মসূচি ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভ নয়; বরং ক্ষোভ, হতাশা ও প্রত্যাশার এক বিস্ফোরণ।
মাঠে উপস্থিত একজন সাংবাদিক হিসেবে সেই বিক্ষোভের ভেতরে প্রবেশ করা ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। চারদিকে কাঁদানে গ্যাস, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, উত্তেজিত স্লোগান—সবকিছুর মাঝেও এমন কিছু দৃশ্য চোখে পড়েছে, যা টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। সহিংসতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল মানবতা, সহমর্মিতা আর দায়িত্ববোধের কিছু অনন্য মুহূর্ত।
যন্তর মন্তরে সাংবাদিকদের ঘিরে মানবঢাল
দিনের শুরুতে যন্তর মন্তরের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। সময় যত গড়িয়েছে, আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্লান্তি আর ক্ষোভ ততই বেড়েছে। এক পর্যায়ে কয়েকজন উত্তেজিত বিক্ষোভকারী পুলিশি ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন এবং সংবাদকর্মীদের দিকেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন।
ঠিক সেই সময়ই কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে এসে সাংবাদিকদের সামনে মানবঢাল তৈরি করেন। তারা উত্তেজিত বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এক শিক্ষার্থী জোর দিয়ে বলেন, "আমরা ন্যায়বিচারের জন্য এসেছি, সহিংসতার জন্য নয়।"
সেই মুহূর্তে স্পষ্ট হয়ে যায়, ক্ষোভ থাকলেও আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যেতে চাননি অধিকাংশ শিক্ষার্থী।
কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যেও মানবিক হাত
দুপুরের দিকে বিক্ষোভের কেন্দ্র চলে যায় রাইসিনা রোডে। তখন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষানীতির ব্যাপক সংস্কারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করতে থাকে। ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঠিক তখনই ধোঁয়ার ভেতর থেকে এগিয়ে আসেন দুই তরুণী বিক্ষোভকারী। তারা কোনো কথা না বলেই প্রতিবেদকের হাতে একটি নতুন মাস্ক তুলে দেন এবং পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে দেন।
চারদিকে যখন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিল, তখন দুই অচেনা তরুণী একজন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। রাইসিনা রোডের উত্তপ্ত পিচঢালা পথে সেই মুহূর্তে কাঁদানে গ্যাসের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল মানবতা।
বৃষ্টির দিনে ছাতার নিচে আশ্রয়
দিনের শেষ অধ্যায়টি লিখেছিল বর্ষার বৃষ্টি।
বৃষ্টি শুরু হলেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান ছাড়েননি। একইভাবে সম্প্রচার চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকও। ভিজে যাওয়া ক্যামেরা ও সরঞ্জাম বাঁচাতে নিজের পোশাক দিয়েই ঢাকার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
এমন সময় প্রায় ২৫ বছর বয়সী এক নারী বিক্ষোভকারী এগিয়ে এসে নিজের ছাতাটি বাড়িয়ে দেন।
সাংবাদিক ছাতাটি নিতে না চাইলে তরুণী শুধু হাসলেন। তারপর বললেন, "আপনি আমাদের গল্পটা সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এই ছাতাটা আমার চেয়ে আপনারই বেশি দরকার।"
বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর আর সেই তরুণীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার ছাতাটি ফেরত দিতে না পারার আক্ষেপ থেকেই যায় প্রতিবেদকের।
সহিংসতার আড়ালে যে গল্প
দিল্লির এই বিক্ষোভের খবরের শিরোনাম হয়েছে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, সংঘর্ষ এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা। কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন প্রতিবেদকের চোখে ধরা পড়েছে অন্য এক বাস্তবতাও।
সেই বাস্তবতায় ছিল এমন কিছু তরুণ-তরুণী, যারা উত্তেজনার মধ্যেও সংবাদকর্মীদের রক্ষা করেছেন, অপরিচিত মানুষের চোখে পানি ঢেলে দিয়েছেন, নিজের ছাতা অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন।
হয়তো এই মুহূর্তগুলো টেলিভিশনের পর্দায় খুব বেশি দেখা যায়নি। কিন্তু দিল্লির শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মানবিক দিকটি বুঝতে গেলে, এই ঘটনাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: কণিকা কাটিয়ার, এনডিটিভি
ভিওডি বাংলা/এমএস








মন্তব্য