মেক্সিকোর মাদক সাম্রাজ্যের ইতিহাসে রক্ত, ক্ষমতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিপুল অর্থের গল্প নতুন নয়। তবে সিনালোয়া কার্টেলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ইসমায়েল "এল মায়ো" জাম্বাদার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শুধু একজন কুখ্যাত মাদক সম্রাটের বিচার নয়—এটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনগুলোর একটির অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির প্রতীক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে কার্যত শেষ হয়ে গেল সেই "পুরোনো সিনালোয়া", যেটি একসময় আন্তর্জাতিক মাদক বাণিজ্যের প্রতীক ছিল। এখন যে সংঘাত চলছে, তা নতুন প্রজন্মের অপরাধী গোষ্ঠীর ক্ষমতার লড়াই।
দারিদ্র্য থেকে মাদক কারবারে:
১৯৪৮ বা ১৯৪৯ সালে মেক্সিকোর সিনালোয়া অঙ্গরাজ্যের এল আলামো গ্রামে জন্ম নেন ইসমায়েল জাম্বাদা। সে সময়ের মেক্সিকো ছিল বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি দেশ। গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্য, সীমিত কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রের দুর্বল উপস্থিতি বহু মানুষকে বিকল্প জীবিকার খোঁজে ঠেলে দেয়।
সে বাস্তবতায় অনেকের কাছে মাদক পাচার ছিল অপরাধের চেয়ে বেঁচে থাকার উপায়।
ইতিহাসবিদ পাবলো পিকাতো লিখেছেন, সে সময় রাষ্ট্র এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করতে পারেনি, যেখানে আইনের একক ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে অনেক অঞ্চলে বৈধ ও অবৈধ অর্থনীতির সীমারেখা কার্যত অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি লাসারো কার্দেনাসের ভূমি সংস্কার এবং পরে সানালোনা ও লোপেজ পোর্তিয়ো বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দক্ষিণ সিনালোয়ার কৃষিতে বড় পরিবর্তন আসে। সেচব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় কৃষি বাণিজ্যিক রূপ পায় এবং অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে শুরু করে।
কিন্তু সেই সমৃদ্ধির পাশাপাশি গড়ে ওঠে মাদক উৎপাদন ও পাচারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। তরুণ জাম্বাদা এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন।
১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় কিছু সময় কাটান। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সেখানেই তিনি আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের কৌশল ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
অন্যদিকে সিনালোয়ার পাহাড়ি অঞ্চল বাদিরাগুয়াতোতে বেড়ে উঠছিলেন আরেক তরুণ—হোয়াকিন "এল চাপো" গুজমান।
পরবর্তীতে গুজমান, জাম্বাদা এবং বেলত্রান লেইভা পরিবার মিলে যে জোট গড়ে তোলে, সেটিই বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদক চক্রগুলোর একটি—সিনালোয়া কার্টেল—এর ভিত্তি স্থাপন করে।
আজ অনেকেই পুরোনো সিনালোয়া কার্টেলকে তুলনামূলকভাবে "শৃঙ্খলাবদ্ধ" বা "নিয়ন্ত্রিত" সংগঠন হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
কার্টেলের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং বিশ্বাসঘাতকতা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
২০০৪ সালে জুয়ারেজ কার্টেলের নেতা রোদলফো কারিয়ো ফুয়েন্তেস হত্যার পর শুরু হয় দুই কার্টেলের ভয়াবহ যুদ্ধ। ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সীমান্ত শহর সিউদাদ জুয়ারেজে বছরে তিন হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এই সংঘাত শুধু প্রাণহানিই বাড়ায়নি; মেক্সিকোর মাদক ব্যবসার চরিত্রও পাল্টে দেয়। আধাসামরিক বাহিনী, ভারী অস্ত্র এবং বিশেষায়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যবহার তখন থেকেই ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে।
ছায়ার আড়ালে 'এল মায়ো'
২০০১ সালে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এল চাপো বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু এল মায়ো ঠিক উল্টো পথ বেছে নেন।
তিনি কখনো প্রচারের আলোয় আসেননি, বিলাসী জীবনযাপন করেননি এবং কয়েক দশক ধরে গ্রেপ্তারও এড়িয়ে যান।
এই নীরব ও নিম্নপ্রোফাইল কৌশলই তাকে দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে রাখে।
ডলারের সাম্রাজ্য:
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিনালোয়া কার্টেল একসময় প্রতি রাতে ১৫ থেকে ২০টি ছোট বিমান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাত। প্রতিটি বিমানে থাকত এক থেকে দেড় টন কোকেন।
এই বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এল মায়ো ও এল চাপো।
পতন ঘরের ভেতর থেকেই: এল মায়োর পতন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টেলের হাতে নয়, বরং নিজের জোটের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অভিযোগ ওঠে, এল চাপোর ছেলে হোয়াকিন গুজমান লোপেজ কৌশলে এল মায়োকে একটি ছোট বিমানে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান, যেখানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঘটনাটি এখনো রহস্যে ঘেরা।
এটি কি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত অভিযান ছিল?
গুজমান পরিবারের সঙ্গে কি কোনো গোপন সমঝোতা হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
এখন সিনালোয়া কার?
এল মায়োর গ্রেপ্তারের পর কার্টেল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
একদিকে এল চাপোর ছেলেদের নেতৃত্বাধীন "লস চাপিতোস", অন্যদিকে এল মায়োর অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এই অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ গত দুই বছরে সিনালোয়াকে নতুন করে রক্তাক্ত করেছে। হাজার হাজার মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—পুরোনো সিনালোয়া কার্টেল কি আদৌ আর টিকে আছে?
অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, পুরোনো সংগঠনটির কার্যত অবসান হয়েছে। এখন যে কাঠামো রয়েছে, তা একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সমষ্টি মাত্র।
অপরাধ অর্থনীতি:
এদিকে মাদক ব্যবসার ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
একসময় কোকেন ও হেরোইন ছিল কার্টেলগুলোর প্রধান আয়ের উৎস। এখন সেই জায়গা দখল করছে সিন্থেটিক মাদক, বিশেষ করে ফেন্টানিল।
অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক মাদক অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর রাসায়নিক মাদকের যুগে প্রবেশ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ জগৎ।
এই পরিবর্তন দেখার সুযোগ আর হবে না এল মায়োর।
তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কেবল একজন অপরাধীর বিচার নয়; এটি মেক্সিকোর মাদক সাম্রাজ্যের পুরোনো শক্তির অবসান এবং নতুন, আরও অনিশ্চিত ও সহিংস এক যুগের সূচনার প্রতীক।
ভিওডি বাংলা/আর









মন্তব্য