বিডার ভরসা দেশি বিনিয়োগে

বর্তমান বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ওপর বেশি ভরসা করছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এ কারণে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানিয়েছেন, এখন বাইরের দেশের দিকে না তাকিয়ে দেশের ভেতরের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং দেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাই মূল লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিডা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রবাহ ও বিনিয়োগ সহজীকরণ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক (পরিসংখ্যান বিভাগ) নূরজাহান আখতার, বিডার নির্বাহী সদস্য ও সচিব মো. হুমায়ূন কবির এবং মহাপরিচালক মো. মুজিবুল-উল-ফেরদৌস উপস্থিত ছিলেন।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কমা পর্যন্ত বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ক্রমশ বিলম্বিত করছেন। বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সরকার দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি স্থানীয় বিনিয়োগের ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। চলমান সংঘাত, জ্বালানির অস্থির মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মনোভাব মন্থর থাকায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক বিনিয়োগ কার্যক্রম দুর্বল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ মুহূর্তে আমরা বাইরে না তাকিয়ে দেশের ওপরই বেশি মনোযোগ দিচ্ছি। এ প্রেক্ষাপটে বিডা দেশীয় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং বেসরকারিকরণ ও নগদীকরণ উদ্যোগের মাধ্যমে অব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বন্ধ শিল্প সম্পদ থেকে মূল্য উন্মোচনের উপায় খুঁজছে।’
বিডা প্রধান জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের প্রচেষ্টা কিছু ইতিবাচক ফল দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলনের পর প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মোট বিনিয়োগও বেড়েছে। তবে অনেক বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।
তার মতে, সম্মেলন থেকে সৃষ্ট বিনিয়োগের ধারাটি প্রাথমিকভাবে দ্রুত প্রকল্পে রূপান্তরিত হবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের সময়সূচি ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, পরবর্তীতে বৈশ্বিক সংঘাত এবং তেলের দাম নিয়ে উদ্বেগ অনেক বিনিয়োগকারীকে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেকে বিনিয়োগ করতে চাননি। তারা বলেছিলেন, নির্বাচনের পরে করবেন। কিন্তু নির্বাচনের পর শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, তখন তেলের দাম বেড়ে যায়। ফলে তেলের দাম কেমন হয় না হয় সেটা বিনিয়োগকারীরা ভাবছে। সেজন্য আমরা দেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি, বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো খোলার চেষ্টা করছি।’
জ্বালানি সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়ে বিডা চেয়ারম্যান বলেন, গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম বড় বাধা। এ সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সোলার পাওয়ার) এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে বিডা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ দুটোরই সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। জ্বালানি না থাকলে আমরা যতই বিনিয়োগ সম্মেলন করি না কেন, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। তবে জ্বালানি সমস্যার কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই। আজ যদি আমরা বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্প শুরু করি, সেটির সুফল পেতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। তাই এখনই এমন উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে দেশের জ্বালানি সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।’
চীন সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা বিনিয়োগ, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের প্রথম দুই বছর বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে আদর্শ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময়কে কাজে লাগিয়ে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিডা চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব অঞ্চল সরকার ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হবে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস







