রিজার্ভ চুরিতে আতিউর রহমান, প্রস্তুত হচ্ছে চার্জশিট

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ছয়টি দেশের ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত ছিল বলে দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমানসহ ১০ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। এ ছাড়া ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও আসামির তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে সিআইডি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, ‘আমাদের তদন্ত শেষ হয়েছে, তদন্তে আমাদের আর কোনো কাজ বাকি নেই। আশা করছি শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দিতে পারব। ইতোমধ্যে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদার নাম রয়েছে। অভিযুক্ত তালিকায় আরও তিন বাংলাদেশির নাম রয়েছে কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ। শেষ তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি বলে জানিয়েছে সিআইডি।
আরও জানা যায়, রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানাকে প্রধান করে একটি ফরেনসিক অডিট করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই অডিটের সময় বেশির ভাগ আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এছাড়া হ্যাকিংয়ে সহায়তা, মানি লন্ডারিং ও চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে ভারতীয় নাগরিক প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্রআথ্রেশ, নীলভান্নান ও মাদুক্কুর আনন্দনের বিরুদ্ধে। খসড়া অভিযোগপত্রে উত্তর কোরিয়ার ল্যাজারাস গ্রুপের পার্ক জিন হিয়োকসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। চীনা নাগরিক গাও শুহুয়াসহ আরও দুজনের নামও রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে (ফেড) থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। এর মধ্যে একটি বার্তার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় একটি ভুয়া এনজিওর নামে ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হলেও বানান ভুলের কারণে তা আটকে যায়। বাকি চারটি বার্তার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপিন্সের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখার চারটি অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ওই অর্থ দ্রুত তুলে নিয়ে ফিলরেম মানি রেমিটেন্সের মাধ্যমে পেসোতে রূপান্তর করে তিনটি ক্যাসিনোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। একটি ক্যাসিনোর মালিকের কাছ থেকে দেড় কোটি ডলার উদ্ধার করা হলেও বাকি অর্থ এখনো উদ্ধার হয়নি। নিউ ইয়র্কের আদালতে আরসিবিসির বিরুদ্ধে মামলা চলছে।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যাওয়া এই সাইবার চুরির ঘটনা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। বাংলাদেশ বিষয়টি জানতে পারে এক মাস পর। সমালোচনার মুখে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন।
এদিকে, ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা। শুরুতে কাউকে আসামি করা হয়নি। মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে সিআইডি। সবশেষ গত ১৮ মে আদালত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আরও এক দফা পিছিয়ে ২ জুলাই নির্ধারণ করে।
সিআইডি জানায়, ফরেনসিক প্রতিবেদন, এফবিআই রিপোর্ট, এমএলএআর, বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা এবং ১৬১ ধারায় নেওয়া জবানবন্দিসহ বিস্তৃত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে।
খসড়া অভিযোগপত্র বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে মতামত পাওয়ার পর তা আদালতে দাখিল করা হবে। এর বাইরে কোনো আইনি পরামর্শ এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এমএস







