কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণ
শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা ও মিরপুরে দাফন সম্পন্ন

বাংলাদেশের গণসংগীত আন্দোলনের ইতিহাসে কামরুদ্দীন আবসার এক উজ্জ্বল ও সংগ্রামী নাম। তিনি ছিলেন- একাধারে প্রখ্যাত গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গানকে মানুষের মুক্তি, ন্যায়বিচার, সাম্য এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কণ্ঠে গণসংগীত শুধু শিল্পচর্চার বিষয় ছিল না; ছিল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও স্বপ্ন দেখার ভাষা।
জন্ম ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণা:
কামরুদ্দীন আবসার ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল মুকিত এবং মাতা উম্মুল ফাতিমা। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ, মফি রইসউদ্দীন এবং শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনের উত্তাল সময়ে পল্টন ময়দানে বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের এক সমাবেশে আলতাফ মাহমুদের গান শুনে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। সেই অনুপ্রেরণাই তাঁকে গণসংগীতের পথে নিয়ে আসে।

সংগীত জীবন ও গণমানুষের লড়াই:
পরবর্তীকালে তিনি আলতাফ মাহমুদের কাছে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৭২ সালে আলতাফ মাহমুদ সংগীত বিদ্যানিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে সেগুনবাগিচা মিউজিক কলেজে অধ্যয়ন করেন। শিল্পীজীবনের শুরুতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি)-এর সংগীত ও পরিচালনা বিভাগে সহকারী হিসেবেও কাজ করেন। তবে খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর শিল্পচর্চার মূল ক্ষেত্র হবে গণমানুষের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম।
গণসংগীতকে তিনি দেখতেন মানুষের সংগ্রামের ভাষা হিসেবে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, গান একই সঙ্গে প্রতিবাদের, ভালোবাসার এবং মানবমুক্তির ভাষা। তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত "চল রে ভাই, উজান বেয়ে যাই", "আমি কোনো ভালোবাসার গল্প জানি না, যেটুকু জেনেছি সবটুকুই যুদ্ধের" এবং "কারা বলছে সামনের পথ অন্ধকার", "আমরা যারা কাজ করে খাই", "জন হেনরী" ও "থাকিলে ডোবা খানা" ইত্যাদি গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগ্রামী মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
আন্দোলন ও সাংগঠনিক ভূমিকা:
১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি লেখক শিবিরের সংগীত ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। সত্তরের দশকের দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহে তিনি গণসংগীত পরিবেশন করেছেন। আশির ও নব্বইয়ের দশকে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে তিনি ছিলেন রাজপথের অন্যতম প্রতিবাদী শিল্পী। তাঁর গান আন্দোলনরত মানুষকে সাহস, শক্তি এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
পরবর্তী সময়েও গার্মেন্ট শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় সম্পদ রক্ষা আন্দোলন, ফুলবাড়ীতে কয়লা খনি রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ফুলবাড়ী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মহসিন শস্ত্রপাণির লেখা "ফুলবাড়ী সাহসের পতাকা" কবিতায় সুরারোপ করে তিনি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখক শিবিরে দীর্ঘদিন কাজ করার পর সাংগঠনিক মতভেদের কারণে তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীকালে কিছুদিন 'ক্রান্তি' নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সংগঠনটির আদর্শিক ও সাংগঠনিক সংকট নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল।
অবশেষে তিনি তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে নতুন সাংস্কৃতিক সংগঠন 'সৃজন' প্রতিষ্ঠা করেন। 'সৃজন' গণসংগীত ও প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। পাশাপাশি তিনি গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সক্রিয় সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৯ সালে গড়ে ওঠা গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের তিনি প্রথম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। অসুস্থ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সৃষ্টিশীল গীতিকার ও সুরকার:
কামরুদ্দীন আবসার শুধু শিল্পী নন, একজন সৃষ্টিশীল গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত অ্যালবামের মধ্যে 'মে দিবসের গান' এবং 'বাংলার কমরেড বন্ধু' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি অসংখ্য গণসংগীত রচনা ও সুরারোপ করেছেন।
গণসংগীতের পাশাপাশি তিনি শামসুর রাহমান, ফয়েজ আহমেদ, লুৎফর রহমান রিটন, সুকুমার বড়ুয়াসহ বহু কবি ও ছড়াকারের শতাধিক ছড়ায় সুর দিয়েছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ছড়াগানের একটি অ্যালবাম নির্মাণের স্বপ্নও তিনি লালন করেছিলেন, যদিও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
আলতাফ মাহমুদ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, শেখ লুৎফর রহমানসহ উপমহাদেশের প্রগতিশীল গণসংগীত শিল্পীদের সান্নিধ্য তাঁর শিল্পীজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে। গণমানুষের জীবনসংগ্রাম, শোষণ-বঞ্চনা, স্বপ্ন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর শিল্পচর্চার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর গানে শ্রমিক, কৃষক, নারী এবং প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি শ্রমজীবী মানুষের কাছে তাঁর গান নিয়ে ছুটে গেছেন। দেশের বাইরে গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের পক্ষ থেকে একাধিকবার ভারতের ত্রিপুরাতেও বিভিন্ন জেলায় তিনি গণসংগীত পরিবেশন করে মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন।
অসুস্থতা ও শেষ প্রয়াণ:
২০১১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন অসুস্থ ও শয্যাশায়ী থাকলেও সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ও আশাবাদ কখনো কমেনি। সহযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের ভালোবাসা তাঁকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শক্তি জুগিয়েছে।
শনিবার (৩০ মে) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ১৪ মে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ফেরদৌসী বেগম, পুত্র আদনান মুকিত দীপ্ত, অসংখ্য সহকর্মী, শিক্ষার্থী, সহযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
শেষ শ্রদ্ধা, জানাজা ও দাফন:
মৃত্যুর পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১:০০টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। এ সময় তাঁর অসংখ্য গুণগ্রাহী, ভক্ত এবং বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সদস্যরা শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই বিপ্লবীবোধের শিল্পীকে শেষযাত্রার বিদায় জানান।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে দাফন করা হয়। এ সময় তাঁর ভালোবাসার মানুষের অশ্রুসিক্ত নয়নে সবাই তাঁকে বিদায় জানান।
কামরুদ্দীন আবসার ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁদের কাছে গান ছিল কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।
তাঁর জীবন, সংগ্রাম এবং শিল্পকর্ম বাংলাদেশের গণসংগীত আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন, প্রগতিশীল সংস্কৃতির চর্চা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের যে ধারাকে তিনি লালন করেছেন, তা আগামী প্রজন্মের সংস্কৃতি কর্মীদের চিরকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে।
ভিওডি বাংলা/জা







