• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

সাজানো নিখোঁজের আড়ালে জোড়া খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২৫ মে ২০২৬, ১২:৪৬ পি.এম.
নিখোঁজের ঘটনায় দুই বছর পর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে সিআইডি। ছবি: ভিওডি বাংলা

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি এলাকায় সৎ মা ও তার শিশু সন্তান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় যে রহস্য তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের তদন্ত শেষে তার ভয়াবহ সমাপ্তি উদঘাটন করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে জোড়া হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে গোপনে লাশ গুম করে রাখা হয় বাড়ির পাশে একটি পুকুরে নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত খুঁড়ে।

ঘটনাটি প্রথমে নিখোঁজ হিসেবে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত এটি জোড়া হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের জটিল মামলায় রূপ নেয়। তদন্ত শেষে একাধিক আসামি গ্রেপ্তার এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। 

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের দিকে কমলা খাতুন নামের এক নারী দ্বিতীয় বিয়ের মাধ্যমে আবুল কালাম আজাদের সংসারে প্রবেশ করেন। দু’জনই পূর্বে বৈবাহিক জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা অবস্থায় নতুন করে সংসার শুরু করেন। এই দম্পতির ঘরে পরে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, যার নাম নোমান। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম সংসারের পাঁচ ছেলে ছিল, যাদের মধ্যে কয়েকজন তখনও পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় পরিবারে সৎ সন্তান ও তাদের পরিবার নিয়ে এক ধরনের জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়। বাহ্যিকভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে সম্পত্তি ও ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, আবুল কালাম আজাদ জীবদ্দশায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন এবং তাদের সন্তান নোমানের নামে প্রায় ৩০ শতাংশ জমি ও বসতবাড়ি লিখে দেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য আনুমানিক এক কোটি টাকার কাছাকাছি।

এই সম্পত্তি নিয়েই মূলত প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধের সূচনা হয়। বিশেষ করে বিদেশ থেকে ফিরে আসা সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর সম্পত্তির মালিকানা পুনর্বণ্টনের দাবি তোলে। পরে এই বিরোধ পারিবারিক সম্পর্ককে চরম উত্তেজনায় নিয়ে যায়। এক পর্যায়ে জমি বিক্রি ও অর্থ ভাগাভাগি নিয়েও মতবিরোধ তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

২০২৪ সালের ৯ মার্চ কমলা খাতুন হঠাৎ নিখোঁজ হন বলে তার সৎ ছেলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। পরদিন থেকেই পরিবার দাবি করে তিনি আর বাসায় ফিরছেন না এবং ফোনেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনায় কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম দ্রুত নোয়াখালীতে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে অসংগতি খুঁজে পান তিনি।

তিনি আশপাশে খোঁজ নিলেও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাননি। ফলে তার সন্দেহ আরও গভীর হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন, যেখানে কয়েকজন সৎ সন্তান ও সহযোগীকে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত প্রথমে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।

সিআইডি প্রাথমিক পর্যায়ে নিখোঁজ ব্যক্তির গতিবিধি, পারিবারিক সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ শুরু করে। তদন্তে ধীরে ধীরে সন্দেহজনক কিছু তথ্য বেরিয়ে আসে, যা মামলাটিকে নিখোঁজ থেকে অপহরণ ও হত্যার দিকে নিয়ে যায়।

তদন্তের এক পর্যায়ে কমলা খাতুনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। ফোনটি ঢাকার একটি ভাঙারি দোকান থেকে পাওয়া যায়, যা আরও রহস্য তৈরি করে।

পরে জানা যায়, ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে বিক্রি করা হয়েছিল। এই সূত্র ধরে তদন্তকারীরা ভাড়াটিয়াদের তথ্য যাচাই করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি পান।

এই বাসার সঙ্গে মামলার এক আসামির পূর্বসম্পর্ক থাকার তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত আরও গভীর হয়। 

সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করে যে সম্পত্তি দখল ও নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তারা আগেই হত্যার পরিকল্পনা করে।

তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়ির পাশে একটি নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে হত্যার পর লাশ দ্রুত গোপন করা যায়। ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে খাবারের পানিতে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মা ও শিশুকে অচেতন করা হয়। পরে গভীর রাতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে।

হত্যার পর অপরাধীরা প্রমাণ লুকাতে ভিকটিমদের মরদেহ নির্দিষ্ট স্থানে পুঁতে রাখে। পরিচয় গোপন রাখতে কাপড়চোপড় সরিয়ে ফেলা হয় এবং ব্যবহার করা কিছু জিনিস পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এছাড়া ঘটনাস্থলে কোনো প্রকার আলামত না রাখার জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে সব চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে। 

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৬ সালের মে মাসে সিআইডি প্রথম দফায় একজন প্রধান আসামিকে ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আরও দুইজনকে নোয়াখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুরো হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক বর্ণনা বেরিয়ে আসে। তদন্তকারীরা প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে এই অগ্রগতি অর্জন করেন।

আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট একটি পুকুরে সেচ ও খনন অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এই অভিযানে কমলা খাতুন ও তার শিশু সন্তানের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। 

গ্রেপ্তারকৃত তিনজন আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। 

বর্তমানে সিআইডি মামলার বাকি সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
শিশু রামিসার খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চায় ‘মুক্তিসরণি’
শিশু রামিসার খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চায় ‘মুক্তিসরণি’
শিশু রামিসা হত্যা: দায় স্বীকার করলেন সোহেল
শিশু রামিসা হত্যা: দায় স্বীকার করলেন সোহেল
মাদকবিরোধী সংগঠনের আড়ালে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
মাদকবিরোধী সংগঠনের আড়ালে ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ