সিগন্যাল ভাঙলেই অটো মামলা, সড়কে ফিরছে শৃঙ্খলা

ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীর সড়কে। ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই এখন সিগন্যাল মেনে চলছেন অধিকাংশ চালক। লাল বাতি জ্বললেই থেমে যাচ্ছে যানবাহন, সিগন্যাল ভাঙার সাহস করছেন না কেউ। কারণ, নগরজুড়ে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা—যা মুহূর্তেই শনাক্ত করছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঠাচ্ছে মামলার নোটিশ।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় বিজয় সরণি ঘুরে দেখা গেছে, আগে যেখানে ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশ উপেক্ষা করে গাড়ি চলে যেত, এখন সেখানে পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে চলছে যানবাহন। চালকদের চোখ এখন ট্রাফিক সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতিতে। নির্ধারিত সময় শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করছেন না।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা
ইমরান সনি বলেন, “এখন আইন ভাঙলেই মোবাইলে জরিমানার এসএমএস চলে আসে। কয়েকদিন আগে ফুটপাথে মোটরসাইকেল তুলেছিলাম, রাতেই দুই হাজার টাকার জরিমানার নোটিশ পাই। এরপর থেকে আর কোনো সিগন্যাল ভাঙি না।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ভিওডি বাংলার প্রাইভেটকার চালক শহিদুল। তিনি বলেন, “আগে অনেকেই প্রভাব খাটিয়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করতো। এখন ক্যামেরা কাউকে চেনে না। আইন ভাঙলেই মামলা হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনাও কমছে, যানজটও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।”
বিজয় সরণির পাশাপাশি ফার্মগেট, বাংলামোটর, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন মোড়েও দেখা গেছে একই চিত্র। অধিকাংশ চালকই এখন সিগন্যাল মেনে চলছেন।
মাগুরা গ্রুপের প্রাইভেটকার চালক সজিব বলেন, “গাড়ির মালিক স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—সিগন্যাল ভাঙা যাবে না। কারণ জরিমানার টাকা চালককেই গুনতে হয়।”
পথচারীরাও পরিবর্তনটি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বাংলামোটর এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় আতিক নামে এক পথচারী বলেন, “আগে রাস্তা পার হতে ভয় লাগতো। মোটরসাইকেল হঠাৎ পাশ কাটিয়ে চলে যেত। এখন পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রিত।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, গত ৭ মে থেকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বর্তমানে গুলশান, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, শাহবাগ, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, গাবতলীসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০৫টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে পিটিজেড এআই ক্যামেরা।
এসব ক্যামেরা সিগন্যাল অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করতে সক্ষম। অপটিক্যাল জুম প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর থেকে গাড়ির নম্বর প্লেটও শনাক্ত করা যাচ্ছে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. আলমাস বলেন, “আগে সড়কে দাঁড়িয়ে মামলা দিতে সময় লাগতো, এতে যানজটও বাড়তো। এখন পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে। আইন ভাঙলেই অটো মামলা হচ্ছে, কোনো ছাড় নেই।”
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ জানান, ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বর প্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরে যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট চালক বা মালিকের কাছে এসএমএস ও নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, গত এক সপ্তাহে প্রায় ১০ হাজার ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি ফুটেজ ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, “এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে অনেক যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট বা নির্ধারিত মানের নয়। কিছু গাড়িতে আরএফআইডি ট্যাগও অকার্যকর। এসব সমস্যা সমাধানে শিগগিরই বিশেষ অভিযান চালানো হবে।”
তিনি যানবাহনের মালিকদের বিআরটিএ নির্ধারিত মানসম্মত নম্বর প্লেট ও কার্যকর আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবহারের আহ্বান জানান।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ







