তামিলনাড়ুতে সরকার গঠন
রাজ্যপালের মধ্যেই ভেজাল, রীতি উপেক্ষায় পরিস্থিতি জটিল

বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তামিলনাড়ু সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা কাটেনি। একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া অভিনেতা থালাপতি বিজয়কে এখনও সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হয় নি। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকার সাংবিধানিক রীতি উপেক্ষা করে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছেন।
নির্বাচনে তামিলনাড়ুর দীর্ঘদিনের দুই প্রধান দ্রাবিড় শক্তি—ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বাইরে গিয়ে ভোটাররা সমর্থন দিয়েছেন বিজয়ের দুই বছর আগে গঠিত দল টিভিকে-কে। দলটি ১০৮টি আসন জিতে একক বৃহত্তম দলের মর্যাদা পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০ আসন পিছিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডিএমকের আসন সংখ্যা ৫৯।
ভারতের প্রচলিত সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, একক বৃহত্তম দলের নেতাকেই প্রথমে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং পরে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে রাজভবন সেই পথে না গিয়ে বিজয়কে দু’দফা ফিরিয়ে দিয়েছে এবং লিখিত সমর্থনের প্রমাণ চেয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের পর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই রাজ্যপাল এই অবস্থান নিয়েছেন।
এ ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কংগ্রেসের তামিলনাড়ু ইনচার্জ গিরিশ চোডাঙ্কর। তিনি অভিযোগ করেন, আরএসএসের সঙ্গে অতীত সম্পর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর চাপের কারণে রাজ্যপাল সংবিধানের পরিবর্তে বিজেপির রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজও। তার ভাষায়, “রাজভবন চূড়ান্ত সত্য নয়, বিধানসভাই আসল জায়গা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণ হবে ফ্লোর টেস্টে। বিজয়ের পক্ষে জনমতের রায় রয়েছে, তাই তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া উচিত।”
এদিকে সরকার গঠনের লক্ষ্যে টিভিকে বর্তমানে কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। কংগ্রেসের ৫টি আসন যুক্ত হলেও জোটের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩-এ, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে পাঁচটি কম। ফলে বাম দল ও থল থিরুমাভালাভানের নেতৃত্বাধীন ভিসিকের সমর্থন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভিসিকে নেতা জানিয়েছেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ সরকার’ গঠনের লক্ষ্যে বিজয় তাদের সমর্থন চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বিজয়কে শপথ নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে কেন?”
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, সরকার গঠন ঠেকাতে পর্দার আড়ালে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য এ জোট নিয়ে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৪ সালের ঐতিহাসিক এস আর বোম্মাই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণের একমাত্র বৈধ ক্ষেত্র হলো বিধানসভার ফ্লোর। রাজভবনে বসে তা অনুমান করার সুযোগ নেই।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রে দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই একক বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান কেন নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চেন্নাইয়ের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক টি আর জওহর বলেন, “প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিজয়কেই আগে সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গভর্নরের কিছু বিবেচনাধিকার থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের উপযুক্ত স্থান বিধানসভাই। সে বিবেচনায় বিজয়কে শপথ গ্রহণের সুযোগ দিয়ে ফ্লোর টেস্টের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ করে দেওয়াই সাংবিধানিকভাবে অধিক যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এসআর







