অনন্ত প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথ
বিশ্বকবির ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী আজ

আজ ২৫ বৈশাখ। বিশ্বকবির ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবতার আকাশে এক অনির্বাণ আলোর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দিনটি উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই মহীরুহকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা সারদা সুন্দরী দেবীর স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা সেই শিশুই একদিন বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দেন বিশ্বসভায়। তার কবিতা, গান ও দর্শনে আজও জেগে থাকে প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা ও মুক্তির চিরন্তন আহ্বান।
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট ২২ শ্রাবণ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেই থেমে যায় তার বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি, প্রতিটি প্রজন্মের হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ আজও বেঁচে আছেন পথিকৃৎ হয়ে।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে তিনি বিশ্বকবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট করেন। প্রধানমন্ত্রী লেখেন- বাংলা সাহিত্যের মহোত্তম কণ্ঠস্বর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার অমর অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তার বিদেহি আত্মার জন্য কামনা করি অনন্ত শান্তি।
তিনি লেখেন, বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণই ছিল তার অবিনাশী সৃজনশীলতার মূল অন্বেষা। কাব্য, সংগীত, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলার পরতে পরতে এই মানুষ, মানবতা, শান্তি, প্রেম ও প্রকৃতির জয়গান গেয়েছেন অনন্যসাধারণ শৈল্পিক কুশলতায়; যা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও চিন্তার জগতের অমূল্য সম্পদ।
কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এ বছরের জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানট, রবীন্দ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা, আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত ও নাট্যানুষ্ঠান।
রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন, তিনি ছিলেন এক বিস্তীর্ণ সৃজনভূমি, যেখানে আজও বাঙালি আশ্রয় খুঁজে পায়। তার বহুমাত্রিক সৃষ্টিসাধক, যার আলো ছড়িয়ে আছে সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবতার প্রতিটি প্রান্তে। দেড় শতাব্দী পেরিয়েও রবীন্দ্রনাথ যেন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধ-বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, প্রকৃতি ধ্বংস কিংবা মানুষের ভেতরের নিঃসঙ্গতার সময়ে তার লেখনী নতুন করে পথ দেখায়। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কিংবা ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ শুধু সাহিত্যিক উচ্চারণ নয়, আজও মানবসভ্যতার জন্য এক গভীর দিকনির্দেশনা।
বাংলা ভাষার আবেগ, সুর ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এমনভাবে মিশে আছেন যে তাকে আলাদা করে ভাবা যায় না। জন্ম থেকে মৃত্যু, প্রেম থেকে বিরহ, উৎসব থেকে শোক-বাঙালির জীবনের প্রতিটি বাঁকে তার গান ও কবিতা অনিবারণীয় হয়ে ওঠে।
বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সম্মানই পাননি, বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যকেও তুলে ধরেছিলেন অনন্য উচ্চতায়।
জাতীয়ভাবে রবীন্দ্রনাথের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আজ শুক্রবার ৮ মে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশব্যাপী উদযাপন করবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’। জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এ বছর কুষ্টিয়ার শিলাইদহে তিন দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ওয়াকিল আহমেদ। বিশেষ অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এবং অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা।
এ ছাড়া নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও খুলনার দক্ষিণডিহিতেও আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার। দেশজুড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতা।
জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি বিশেষ স্মরণিকা ও পোস্টার প্রকাশ করবে। আয়োজকদের মতে, বিশ্বকবির শান্তি, মানবতা ও মানবিক মূল্যবোধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
এ ছাড়া রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে করেছে ৮ থেকে ১১ মে পর্যন্ত ৪ দিনব্যাপী ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানমালার।
ছায়ানট আয়োজন করেছে ৮ ও ৯ মে দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব। এ ছাড়া চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করবে নানা অনুষ্ঠান।
শিলাইদহে তিন দিনের অনুষ্ঠান
কুষ্টিয়া জানান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবদ্দশায় অধিকাংশ সময় কাটান শিলাইদহের কুঠিবাড়ীতে। এখানে বসেই তিনি রচনা করেন গীতাঞ্জলি কাব্য। তার জন্মদিন উপলক্ষে আজ কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী পালনের অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে প্রশাসন।
অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লাসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা যোগ দেবেন। তবে কুষ্টিয়ার জামায়াতে ইসলামীর ৩ এমপির মধ্যে কেউ যোগদান করছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া-২ এর এমপি আব্দুল গফুর, কুষ্টিয়া-৩ এর এমপি মুফতি আমির হামজা ও কুষ্টিয়া-৪ আসনের এমপি আবজাল হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগযোগ করার চেষ্টা করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।
উৎসবমুখর নওগাঁর পতিসর
নওগাঁ শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে আত্রাই উপজেলার নিঝুম-নিস্তব্ধ-নিভৃত পল্লী পতিসর। কবিগুরু রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর কালীগ্রাম পরগনার জমিদারিপ্রাপ্ত হয়ে প্রথম পতিসরে আসেন ১৮৯১ সালে। এখানে বসে রচনা করেছেন অনেক কবিতা গল্প, প্রবন্ধ। তারই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবার জাতীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসব।
নওগাঁর আত্রাই-রাণীনগর আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম জানান, অনুষ্ঠান মনোমুগ্ধকর করতে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মী, আত্রাই-রানীনগর দুই উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পুলিশ প্রশাসনের টিম কাজ করে যাচ্ছে।
শাহজাদপুরে হচ্ছে রবীন্দ্র উৎসব :
আজ সকালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কবির স্মৃতিবিজড়িত শাহজাদপুরের কাচারি বাড়িতে এ উপলক্ষে সব প্রস্তুতি শাহজাদপুর উপজেলা প্রমাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন। তিন দিনের অনুষ্ঠানমালায় থাকছে আলোচনা প্রবন্ধ পাঠ ও প্রবন্ধের ওপর আলোচনা, নৃত্য, আবৃত্তি, নাটক ও সংগীত।
ভিওডি বাংলা/এসআর







