• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

বিএনপির ছাত্র ও যুব সংগঠনে নেতৃত্বে চলছে অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা

মো. আহসান হাবিব    ২ মে ২০২৬, ০২:৫৬ পি.এম.
ছবি : সংগৃহীত

বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন ঘিরে দলের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে। এখন মূল বিতর্ক-কমিশন গঠন না প্রচলিত কাউন্সিল বা সিলেকশন পদ্ধতি, মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব, ব্যর্থতার জবাবদিহি নাকি নতুনভাবে শুরু-কোন পদ্ধতিতে হবে নেতৃত্ব নির্বাচন? বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় বিএনপি। 

তবে সব পক্ষের অভিন্ন দাবি-একটি সিন্ডিকেটমুক্ত, গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি তুলেছে সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশ। তাদের মতে, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গঠন সম্ভব নয়। আবার আরেকটি অংশ এখনো আগের পদ্ধতি সিলেকশনের পক্ষেই অবস্থান করছে। 

‘গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে ছাত্রদল, দরকার জবাবদিহি’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের সাবেক এক সভাপতি বলেন, নব্বই দশকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদল ক্যাম্পাসমুখী হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে করুণ পরিণতির গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, “আমাদের দরকার এমন ছাত্রনেতা, যারা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারবে এবং কার্যকর কাউন্টার ন্যারেটিভ দিতে সক্ষম হবে। বাস্তবতা হলো আমরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হেরেছি। শিক্ষার্থীদের সমর্থন পুনরুদ্ধারে মেধাবী, সৃজনশীল ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দরকার।”

তিন অঙ্গ সংগঠনের বর্তমান অবস্থা

ছাত্রদল:
২০২৪ সালে মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাসির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠিত হয়। সাধারণত দুই বছর মেয়াদি এ কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক দল:
৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজিব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে।

যুবদল:
১০ জুলাই ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এ কমিটি এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি।

কেন জোরালো হচ্ছে কমিশনের দাবি?

দাবির পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে-দীর্ঘদিন ধরে অনেক জেলা কমিটি স্থবির হয়ে আছে। নেতৃত্ব নির্বাচনে ‘সিন্ডিকেট’ প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মীদের মূল্যায়ন না হওয়া এবং সাংগঠনিক জবাবদিহির ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। অনেক জেলায় পাঁচ থেকে আট বছর ধরে একই কমিটি বহাল রয়েছে, যা সংগঠনের গতিশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ।

‘কমিশন অপ্রয়োজনীয়’-ভিন্নমতও আছে
তবে কমিশন গঠনের বিষয়ে সবাই একমত নন। ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাছির বলেন, “আমাদের কমিটির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালের কাউন্সিলে কাউন্সিলররা সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দিয়েছেন। তিনি চাইলে যে কোনো সময় কমিটি হবে।”

কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটি নিষ্প্রয়োজন। এতে সংগঠনের ঐতিহ্য থাকে না। কাউন্সিল বা সিলেকশন-এই দুই প্রক্রিয়ার যেকোনো একটিতে কমিটি হলেই সংগঠন শক্তিশালী হবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ভিওডি বাংলাকে বলেন, ‘বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলো সুনির্দিষ্ট ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেই দলগুলো প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালিত হয়ে আসছে। ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র সময় উপযোগী করার জন্য কখনো কখনো সংশোধিত হয়েছে। সে কারণে কমিশনের কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না।’

ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান বলেন, দমন-পীড়নের মধ্যেও ছাত্রদল আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা অপপ্রচারের জবাব দিতে পারবে এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

ছাত্রদল নেতা শরীফ শুভ বলেন, দেশপ্রেমিক, সৎ, উদ্যমী ও সাহসী শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রদল অপেক্ষা করছে-যারা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও সুশাসনে বিশ্বাসী।

সহ-সভাপতি সাফি ইসলাম বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত ও সংগঠনকে ধারণ করে-এমন ব্যক্তিদেরই নেতৃত্বে আসা উচিত। বাইরে থেকে কাউকে বসিয়ে দিলে সংগঠন সক্রিয় থাকে না।
সিন্ডিকেট বিতর্ক ও তৃণমূলের ক্ষোভ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেন্দ্রীয় নেতা অভিযোগ করেন, বর্তমান কমিটি কিছু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি দিলেও অধিকাংশ জেলা কমিটি দিতে পারেনি। ফলে বহু জেলায় পুরনো কমিটি বহাল রয়েছে।

তিনি দাবি করেন, একটি সিন্ডিকেট নিজেদের বলয়ে কমিটি নিতে চায়। নিজেদের দেওয়া কমিটির মাধ্যমে কাউন্সিল হলে নেতৃত্ব কুক্ষিগত করার সুযোগ তৈরি হয়।

মহানগর কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন

ঢাকা মহানগর ছাত্রদলকে চার ভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে সংগঠনের ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হয়েছে। অনেকেই মহানগরকে আবার দুই ভাগে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

স্বেচ্ছাসেবক দল যা বলছে:

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, দলের চেয়ারম্যান যাকে দায়িত্ব দেবেন, সংগঠনের সবাই সেটি মেনে নেবেন।

সহ-সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, গত ১৭ বছরের আন্দোলনে যারা সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে তাদের মূল্যায়ন করা হবে-এটাই তাদের প্রত্যাশা।

যুবদল নিয়েও নীরব প্রতিযোগিতা:

যুবদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হতে এখনো এক বছরের বেশি সময় বাকি। তবুও সম্ভাব্য নেতারা নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠছেন।

একাংশ মনে করছে, নতুন নেতৃত্ব সংগঠনকে আরও গতিশীল করবে। অন্যদিকে আরেক অংশ বলছে, নির্ধারিত সময়ের আগে কমিটি পরিবর্তন করলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে এবং চলমান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। কমিশনের মাধ্যমে নতুন কাঠামো নাকি প্রচলিত পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন-এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে সংগঠনগুলোর ভবিষ্যৎ শক্তি, গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক কার্যকারিতা।

ভিওডি বাংলা/জা

 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, পুরনো বিরোধে বাড়ছে প্রকাশ্যে খুন
আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, পুরনো বিরোধে বাড়ছে প্রকাশ্যে খুন
এক মিনিটের মিশনে স্তব্ধ আন্ডারওয়ার্ল্ড, আলোচনায় জোসেফের নাম
এক মিনিটের মিশনে স্তব্ধ আন্ডারওয়ার্ল্ড, আলোচনায় জোসেফের নাম
ইরানের নতুন শান্তি প্রস্তাবে বদলাচ্ছে কি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ?
মস্কো-ওয়াশিংটনে নতুন সমীকরণ ইরানের নতুন শান্তি প্রস্তাবে বদলাচ্ছে কি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ?