ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত

এ বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল বলে উল্লেখ করেছে ইন্টারন্যাশাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। পাশাপাশি গ্রুপটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে।
এ বিষয়ে আইসিজি’র বাংলাদেশ ও মিয়ানমার-বিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিন বলেছেন, নির্বাচন অনেকটাই সহিংসতা ও অনিয়মমুক্ত ছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও ছিল শান্তিপূর্ণ। বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শিরোনামের একটি মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রকাশ করে আইসিজি।
প্রতিবেদনে সরকারের আসু চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরুঙ্কুশ বিজয় পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের (বিএনপি) সামনে এখন ব্যাপক সংস্কারের জন-প্রত্যাশা পূরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ হবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূলে থাকা বিরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জনগণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেয়া।
সরকার যদি জনসমর্থন ধরে রাখতে চায় তাহলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে আইসিজি। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়, সরকার জনসমর্থন ধরে রাখতে চাইলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জননিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের একটি বৃহৎ অংশ বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করে আইসিজি।
সরকারের চ্যালেঞ্জের বিষয়টি উল্লেখ করে থমাস কিন বলেন, দুই মাস না পেরোতেই সরকারের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিএনপি’র জন্য এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করা, যা ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ ছাড়া ওই অঞ্চল কৃষিখাতের জন্য প্রয়োজনীয় সারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার ঘটনা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন থমাস। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
থমাস বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল সরকারি কোষাগারের ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে না, বরং এটি লাখ লাখ বাংলাদেশিকে পুনরায় দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মূল্যায়নে বলা হয়, বহু বাংলাদেশির কাছে এবারের নির্বাচন কেবল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কেননা ২০০৮ সালের পর এবারের নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল একটি বড় বিষয়। হাসিনা আমলের তিনটি নির্বাচনের ব্যাপক অনিয়মের কথা তুলে ধরেছে আইসিজি। সেখানে বলা হয়, শেখ হাসিনার সময়ে তার সরকার তিনটি অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে, যেগুলো বিরোধী দলের বর্জন, ভোটারদের কম উপস্থিতি এবং ব্যাপক অনিয়মের জন্য সমালোচিত হয়েছিল।
এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে চব্বিশের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায় শেষ হয়েছে উল্লেখ করে আইসিজি জানিয়েছে, দেশকে স্থিতিশীল করতে কাজ করেছে অন্তর্বর্তী প্রশাসন। সেসময় অর্থনীতি ছিল টালমাটাল। হাসিনা পরবর্তী ১৮ মাস সামাল দেয়া অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সহজ ছিল না উল্লেখ করে আইসিজি’র মূল্যায়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তাদের ঘোষিত তিনটি অগ্রাধিকারের মধ্যে ছিল সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। এক্ষেত্রে তারা আংশিক সফল হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক বাধার কারণে কিছু লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য বজায় রাখতেও তাদের আপস করতে হয়েছে।
এরপরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায় উল্লেখ করে আইসিজি’র মূল্যায়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সঙ্গে আয়োজিত গণভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পেয়েছে। যারা সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে তাদের মতে, জুলাই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। যার মধ্যে সংবিধান সংশোধন, সুশাসনের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং দেশে স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিএনপি জুলাই সনদের কোন বিধানগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, চূড়ান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের বিষয়ে দলটির আপত্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারকে গুরুত্ববিবেচনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সবরকম সংঘাত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/এসআর







