• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

পড়তে পারার ঐশ্বর্য

   ৩১ জানুয়ারী ২০২৫, ১২:৪২ পি.এম.

খান মুহাম্মদ রুমেল

গণমাধ্যমকর্মী

শীত কি চলে গেছে এবারের মতো? নগর প্রকৃতি দেখলে তাই মনে হয়। কিন্তু দূরের জনপদে, যেখানে জীবন আর প্রকৃতি মাখামাখি করে বাঁচে, সেখানে এখনো বইছে হিমেল শীত। কোথাও কোথাও মাত্রাটা যেন কিছুটা বেশিই। তবে ইটনগরী ঢাকায় যেন বসন্তের আমেজ। ভ্যাপসা গরম নেই। একটা আরামদায়ক আবহাওয়া। হ্যাঁ পরিবেশ দূষণের বিষ আছে বাতাসে। ভয়াবহ মাত্রায়ই আছে। তবুও এ আরামদায়ক উষ্ণতা বড় ভালো লাগে।

আর এসবের মাঝেই চিরায়ত নিয়মে শেষ হয়ে যাচ্ছে ইংরেজি বছরের প্রথম মাস- জানুয়ারি। কড়া নাড়ছে ফেব্রুয়ারি। এই ফেব্রুয়ারির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আবেগ, গৌরব এবং শোকস্মৃতি। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য বাঙালিকে আন্দোলন করতে হয়েছে। মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ স্লোগানে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হয়েছে। জেল জুলুম খাটতে হয়েছে। বুকের রক্তে রাজপথ লাল করতে হয়েছে। অবশেষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- আ-মরি বাংলা ভাষা। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ এখন আর শুধু বাঙালির নয়। এই গৌরব এখন আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে। ভাষার জন্য বাঙালির জীবন দানের দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

আরেকটি কারণে ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ফেব্রুয়ারিতে মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বইমেলা। বাঙালির প্রাণের মেলা। পুরো একটি মাস বাঙালি মেতে থাকে বইয়ের গন্ধে। বিকেল থেকে রাত অব্দি বইপ্রেমী মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে থাকে বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। পাঠ বিমুখের তকমা পাওয়া বাঙালির বইমেলা কেন্দ্রিক এই ভিড় দেখে বড় ভালো লাগে ।

পড়তে পারাটা একটা বিশাল ব্যাপার। হাজার বছর বয়সী পৃথিবীতে কত মানুষ। কত বিচিত্র রঙের জিনিস এই দুনিয়ায়। কত মানুষের কত অভিজ্ঞতা। কত কত সভ্যতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পৃথিবীর প্রান্তরজুড়ে। এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এক ক্ষুদ্র কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি মানুষ। কিন্তু মাত্র সত্তর/আশি বছরের জীবন একেকজন মানুষের। এক জীবনে কি তাই সব দেখা সম্ভব হয়? সব শোনা সম্ভব হয়? হয় না। মানুষ কি চাইলেই অতীতে ফিরে যেতে পারে? পারে না? এই যে না হওয়া, এই যে না পারা- এসব কিন্তু দূর করতে পারে বই। ধরুন- বইয়ের মাধ্যমেই আমাদের যোগাযোগ হতে পারে সক্রেটিসের সঙ্গে। তাকে নিয়ে লেখা, কিংবা তার লেখা একটি বই পড়ছেন— তার মানে আমার কাছে মনে হয় সেই প্রাচীন এথেন্সের পথ ধরে হাঁটছেন। দেখছেন কেমন ছিল তখনকার মানুষের জীবনযাপন। সমাজে বইতো তখন কেমন স্রোত। এখনকার মতো নানা নিয়ম অনিয়মের চোরাবালিতে তখনও কি হারাতো অনেক প্রতিভা? সব যেন প্রত্যক্ষ করছেন আপনি একটি বইয়ের মাধ্যমে। কিন্তু চাইলেই কি জীবনে আপনি ফিরতে পারবেন সেই হাজার হাজার বছর আগের প্রাচীন গ্রিসে?

রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা পড়ছেন মানে— তার সঙ্গেই আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন পদ্মা নদীতে বজরায় চড়ে। একবার ভাবুন তো সেই পদ্মা নদী তো এখনো আছে, আপনার আমার চোখের সামনেই আছে। হয়তো আমি আপনি এখনো নানা কাজে পদ্মা পাড়ি দেই, কিংবা তখনো অকাজে অলস বসে থাকি পদ্মার পাড়ে। কিন্তু চাইলেই কি ফিরতে পারবো রবীন্দ্রনাথের সময়ে? কিন্তু একটি বই, একটি গল্প কিংবা কবিতা আমাকে আপনাকে নিয়ে যেতে পারে শত বছর কিংবা হাজার বছর পেছনের কোনো রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে!

পড়তে পারাটা তাই বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়। যারা পড়েন তাদের আমি শ্রদ্ধা করি।
একটা কথা বলি- অনেকেই আমার সঙ্গে দ্বিমত করবেন জানি। তবুও বলি। যারা পড়তে পারেন- তাদের বড় একটা অংশ একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে খুব বেশি একটা পড়েন না। যারা বিশেষ জ্ঞানে জ্ঞানী তাদের কথা অবশ্য আলাদা। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা যারা এমএ, বিএ পাস করেছি তাদের কথা বলছি। পরীক্ষা পাসের জন্য আমরা হয়তো কিছু তত্ত্ব, কিছু বর্ণনা মুখস্ত করেছি, তারপর সেগুলো পরীক্ষার খাতায় উগরে দিয়ে একের পর এক সার্টিফিকেট জোগার করেছি। কিন্তু সেই পড়া, পরে আমরা কতটুকু মনে রাখতে পেরেছি? আমাদের জীবনযাপনে, আমাদের মননে, আমাদের কর্মজীবনে পরে সেই পড়া কতটা কাজে লেগেছে? কিন্তু একাডেমিক বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে মনের আনন্দে যারা পড়েন, পড়েছেন- ভেবে দেখুন তারা আপনার আমার চেয়ে এগিয়ে গেছেন কি না?

আমি এক তরুণকে চিনতাম। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। যে পরিবারে পাঠ্যবইয়ের বাইরের পড়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। কিন্তু সেই ছেলেটার ছিল অদম্য পড়ার নেশা। কিন্তু পড়ার জন্য এত বই কই? পাড়ায় পাঠাগার কই? ছেলেটা তাই বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে ধার নিয়ে বই পড়ে। তাতেও তার পড়ার তৃষ্ণা মেটে না। সে নীলক্ষেতে যায়। পুরনো বই কেনে। তাও টাকার অভাবে সব বই কিনতে পারে না। বই নেড়েচেড়ে রেখে চলে আসে। দেখেও যেন তার শান্তি। বই নাড়াচাড়া করেও যেন সে পড়ার আনন্দ পায়। সেই ছেলেটা বছর জুড়ে বাসার পুরনো খবরের কাগজ জমিয়ে রাখে। ফেব্রুয়ারি এলে সেই কাগজ বিক্রি করে,  টাকা নিয়ে বইমেলার দিকে ছোটে। ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের বইমেলায় সে পায়ে হেঁটে যায়। বাসে কিংবা রিকশায় গিয়ে ভাড়ার পেছনে টাকা খরচ না করে, সেই টাকাও বই কেনার পেছনে খরচ করতে চায় সে। অনেক বছর পর সেই ছেলের সঙ্গে আমার দেখা। জীবনে তার অর্থনৈতিক উন্নতি কতটা হয়েছে বুঝতে পারিনি। তবে বুঝেছি সেই ছেলেটি এখন খুব উন্নত মনের মানবিক মানুষ!

পলান সরকারের কথা মনে আছে? বাংলাদেশের উত্তরের জনপদে ঘুরে ঘুরে মানুষের মাঝে বই বিলি করতেন। আচ্ছা, পলান সরকার কেন চাইতেন আমরা পাঠক হয়ে উঠি?

আতিফ আসাদ নামে জামালপুরের সরিষাবাড়ির এক ছেলে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। মানুষের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করেন, মানুষকে পড়ানোর জন্য। পাঠক বানানোর জন্য। আতিফ আসাদ কেন চান আমরা পাঠক হয়ে উঠি?
খুলনার সেলুন পাঠাগারের কথা বলা যায়। স্বল্প আয়ের মানুষ সেলুনের মালিক। নিজের সেলুনে আসা মানুষ বসে বসে আড্ডা দেয়, তিনি তাদের জন্য ব্যবস্থা করলেন বইয়ের। ছোট দোকানে শেলফে রেখে দিলেন বই। এখন লোকজন এসে বই পড়ে। তার চাওয়াটা আসলে কী?

বছর ঘুরে আবার এসেছে বইমেলা। বইমেলা একটা উপলক্ষ্য মাত্র। আসুন এই উপলক্ষ্য ধরে আমরা পাঠক হয়ে উঠি। আমরা সবাই মানবিক মানুষ হই।

ভিওডি বাংলা/এম


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে যেতে দেবো না
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
আমাদের সম্পাদক একজন মুক্তিযোদ্ধা, আমরা গর্বিত
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়
সত্যিই ভিওডি বাংলা-পথ দেখে, পথ দেখায়