নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপিতে বাড়ছে অসন্তোষ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিদায় নেওয়ার পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিএনপি শুরু থেকেই সমর্থন ও আস্থা প্রকাশ করে এলেও নির্বাচনের 'সুস্পষ্ট' সময় সীমা নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় এখন প্রতিনিয়ত দলটির নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে।
যদিও বিএনপির নীতি নির্ধারণী ফোরাম মনে করছে; রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি'র রোডম্যাপ ঘোষণার তাগিদের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য সময়সীমা ঘোষণা করেন। কিন্তু, তাতে 'অস্পষ্টতার' অভিযোগ তুলে অসন্তোষ প্রকাশ করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগেও, উপদেষ্টাদের কারো কারো বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে দলটিকে। উপদেষ্টাদের সেসব বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে যে ভাষ্য প্রকাশ পেয়েছিল তাতে বিএনপির প্রতিই ইঙ্গিত ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কারণ বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সব কথা মূলত নির্বাচন ও সংস্কারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। নির্বাচন নাকি সংস্কার, কোনটি অগ্রাধিকার পাবে এই প্রশ্নেই বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
বিএনপি ন্যূনতম জরুরি সংস্কার করে নির্বাচনের পক্ষে আর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা, জামায়াত এবং বেশ কিছু রাজনৈতিক দল সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়ার পক্ষপাতী।
বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ডেমোক্রেটিক অর্ডারে (গণতান্ত্রিক ধারায়) দেশটাকে ফিরিয়ে নেয়া এক নাম্বার প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার)। ১৬ বছর ধরে মানুষ রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে গণতন্ত্রের জন্য, দেশের ওপর তার মালিকানা ফিরে পাবার জন্য। যারা সেটা অনুধাবন করতে পারবেন না সেটা তাদের সমস্যা, আমাদের সমস্যা নয়। এখনো আশা করি আমাদের মতামত আমলে নিয়ে তারা সঠিকভাবে দেশটা পরিচালনা করবে এবং সামনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করবে।
অবশ্য সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে থাকা কোনো পক্ষের সাথেই অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ধরনের কোনো মতভেদ হয়েছে, এমনটা তারা অনুভব করেন না। রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন, বিচার এগুলো জটিল প্রক্রিয়া। এসব ক্ষেত্রে মতভিন্নতার মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটা কমিশন গঠন করা হচ্ছে। কোনো ধরনের আস্থার সংকটও তৈরি হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার কৌশলী হয়ে নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমতে কিংবা বাড়তেও পারে বলে যেসব ধারণা দিচ্ছে, সেগুলোই ধোঁয়াশা ও সংশয় বাড়াচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে নির্বাচনের সময়সীমা একরকম স্পষ্টই করা হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে এর অন্যথা হওয়ার কথা নয়।
এদিকে জেলায় জেলায় নেতাকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করছে বিএনপি। সবশেষ গত বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জ, নরসিংদী ও মুন্সিগঞ্জ জেলার কর্মশালায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে অনেকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দুর্বল জনসমর্থনহীন সরকার যারা জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, এ রকম সরকারকে যদি ক্ষমতায় রাখা যায়, তাহলে এ দেশ থেকে অনেকে অনেক কিছু লুটেপুটে নিয়ে যেতে পারবে।
ওইদিন সকালেই এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও তার প্রেস সচিবের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। এমন বক্তব্য বিভ্রান্তি ছড়াবে। আমরা হতাশ হয়েছি। রাজনৈতিক দলগুলো সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করে।"
গত ১৬ই ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মোটাদাগে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়। পরদিন সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, "চূড়ান্ত তারিখ কী? সেটা নির্ভর করবে সংস্কারের ওপর।... আপনি আশা করতে পারেন ২০২৬ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে।
এর আগে, গত ১২ই ডিসেম্বর "রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে, সরকারের তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের এমন মন্তব্যকে 'রাজনীতিবিরোধী' বলে অভিহিত করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রাথমিকভাবে ছয়টি কমিশন গঠন করে যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। তাদের প্রতিবেদন আসার আগেই পুরনো আইনের অধীনে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা সম্ভাব্য সময়সীমা জানানোর পর তার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, এবার দিনক্ষণ অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সরকারের কাজ তাদের সহায়তা দিয়ে যাওয়া। তারপরও বিএনপি নেতাদের তরফে সময়সীমা নিয়ে তাগিদ দেওয়া কমেনি। তাহলে কি সরকারের প্রতি দলটির 'আস্থা' ও 'সমর্থন' এর মনোভাবে পরিবর্তন এসেছে? অবশ্য বিএনপি নেতাদের বক্তব্যকে তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
অধ্যাপক নজরুল ব্যাখ্যা করেন, রাজনৈতিক কৌশল এক জিনিস আর রাজনৈতিক পরিকল্পনা অন্য জিনিস। এখন বিএনপি হয়তো রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এগুলো বলছে। কিন্তু আমরা কখনো ফিল করি না যে বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যারা আন্দোলনের পক্ষে ছিল তাদের সাথে বড় ধরনের কোনো মতভেদ হয়েছে।
এদিকে বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বেশ কয়েকবার 'সংস্কারের প্রয়োজনে যদি'র উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। সরকারের তরফে সংস্কারের শর্তসাপেক্ষে নির্বাচনের সময়সীমা উল্লেখ করায় বিএনপির মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, বিএনপি'র সবার বক্তব্য যদি একসাথে রাখি, বিএনপি একটা অস্থিরতায় ভুগছে দলগতভাবে। তারা শঙ্কায় ভুগছে এক এগারোর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে কি না। বিএনপির মধ্যে হয়তো এই শঙ্কাও কাজ করছে যে তারা যদি এই মুহূর্তে নির্বাচনে যেতে না পারে তাহলে তাদের জনসমর্থনে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে এমনকি জনসমর্থন ঘুরে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কারণ সরকার পতনের পরের দুই মাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দলের সর্বোচ্চ ফোরাম স্থায়ী কমিটি সদস্য থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে বিএনপিকে।







