• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

কোন পথে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক !

   ২১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৩ পি.এম.

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম । কিন্তু তার দশ দিন আগেই ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত। পরের বছর ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে বন্ধুত্ব চুক্তি হলেও ভারত শুরু থেকেই বাংলাদেশে তার আধিপত্য বিস্তার করতে চেয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রতি ভারতের ছিল অগাধ বিশ্বাস। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের ১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, তার অধিকাংশ চুক্তিতে সুবিধা পেয়েছে দিল্লি। ভারত সরকারও বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মূল্যায়ন না করে একতরফাভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছে।

বাংলাদেশের নয়, ভারত সব সময় নিজেদের স্বার্থই দেখেছে এমন বিশ্বাস বাংলাদেশের মানুষের মনে শক্তভাবে জায়গা করে নিয়েছে। ‘ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা সারা জীবন মনে রাখবে’ শেখ হাসিনার এই উক্তিটিই তা প্রমাণ করে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হজম করতে পারছে না যেন ভারত। প্রতিনিয়ত ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নানান ইস্যুতে অপপ্রচার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই ভারতের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য ‘ভূমিকা’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়ে থাকে। বিশেষ করে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে ব্যপক আলোচনা রয়েছে।

২০০১ সালে নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে সংবিধানে একটি বড় সংশোধনী আনে বিএনপি সরকার। এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে আওয়ামী লীগ। সংঘাতময় এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। এরপর ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলেও কার্যত সেটি পরিচালনা করেছে সেনাবাহিনী। অভিযোগ ওঠে, শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতির বাইরে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ভারতের হস্তক্ষেপে সেটির সফলতা না পেয়ে অনেক আলোচনা, সংলাপ ও কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলা হয়।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি নিজের আত্মজীবনীতে দাবি করেছেন, খালেদা ও শেখ হাসিনাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি নিজে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তবে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভারত চায়নি বিএনপি ক্ষমতায় আসুক। তাইতো আওয়ামী সরকারের বিজেয়ের পরদিন শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল ভারত।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বাক বদল হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের সাধারন নির্বাচনের ইতিহাসে ২০০৮ সালের নির্বাচনটি ছিল সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার না দেওয়ায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে, এ নির্বাচনে ভারতের তথাকথিত ‘হস্তক্ষেপ’ সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশে আসেন।

ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে তখন বলা হয়েছিল, জাতীয় পার্টিকে চাপ দিয়ে নির্বাচনে নিয়ে আসতে এবং নির্বাচনকে একটি ‘গ্রহণযোগ্য’ চেহারা দিতেই সুজাতা সিং এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা সফর করেছিলেন। হয়েছিলও তাই, শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি এবং বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে আগে থেকেই ভারত প্রকাশ্যে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। কারণ, নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভারতের অত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন করেনি, এমনটাই স্বীকারও করেছিলেন তৎকালীন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার।

বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও নির্বাচনে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন শেখ হাসিনার দিকেই ছিল, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে গোপন ছিল না।

বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগের রাতেই ভোট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়। সেই কারচুপির কিছু ভিডিও প্রকাশও হয়। পরে নির্বাচন বয়কট করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ায় বিএনপি। অথচ, নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্রও সমালোচনা করা হয়নি। শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থন যে দলমতনির্বিশেষে সেটাই আরও একবার প্রমাণিত হয়।

শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে এবারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে ভারত।

সবশেষ ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅবুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। শেখ হাসিনা পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানে বসে দেশের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যেই ৯ ডিসেম্বর দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকটি নিয়মিত বলা হলেও উভয় দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে এই বৈঠক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিও বলেছেন, আমরা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাই। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং পারস্পরিক স্বার্থ নির্ভর সম্পর্ক চাই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিন বলেন, সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই দেশ একমত হয়েছে। দুই দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অস্বস্তিকর বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৭০ শতাংশ খালাস, সাজার হার ৩ শতাংশ!
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৭০ শতাংশ খালাস, সাজার হার ৩ শতাংশ!
ডিসি সম্মেলন শুরু হচ্ছে কাল : আলোচনায় উঠছে ৪৯৮ প্রস্তাব
ডিসি সম্মেলন শুরু হচ্ছে কাল : আলোচনায় উঠছে ৪৯৮ প্রস্তাব
বাস্তবতা এখনো জটিল, অনিশ্চয়তার অন্ত নেই
আজ মহান মে দিবস বাস্তবতা এখনো জটিল, অনিশ্চয়তার অন্ত নেই