স্মরণ
আমার দেখা এক স্বৈরাচার, প্রেমিক ও এক কবি এরশাদ

আমাদের সরাসরি কথা হয় দেড় যুগ আগে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি থেকে স্টাফ রিপোর্টার বা নিজস্ব প্রতিবেদক পদোন্নতির প্রাক্কালে বনানী মাঠে জাতীয় পার্টির একটি সমাবেশ কভার করতে গিয়ে। যেটি ছিল আমার কভার করা প্রথম কোনো বড় রাজনৈতিক সমাবেশ। ওয়ান ইলেভেনপূর্ব ও পরবর্তী সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের কথা বলছি, যখন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল (অব.) এইচ এম এরশাদ রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। তার মনোভাবের ওপর নির্ভর করছিল পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও এ দেশটির পরবর্তী ভবিষ্যৎ।
বনানীর ওই সমাবেশের আয়োজক জাতীয় পার্টি, প্রধান অতিথি দলের চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ। বিকাল ৪টার দিকে মঞ্চে এলেন এরশাদ। অনুষ্ঠান শেষ হলো মাগরিবের আজানের ক’মিনিট আগে। আমার অফিস তখন কাকরাইলে। সড়কে তীব্র যানজট। ভাড়ায় মোটরসাইকেল তখনও চালু হয়নি এ শহরে। পকেটে যে টাকা আছে তা দিয়ে সিএনজি ভাড়া হবে না। আর বাস, রিকশা ও কিছু হাঁটাপথ পার হয়ে বনানী থেকে অফিসে ফিরতেই রাত ৯টা বেজে যাবে। এরপর কাগজে কলম দিয়ে রিপোর্ট লেখা, সেটি প্রধান প্রতিবেদক, সাব এডিটর ও বার্তা প্রধানের হাত হয়ে সম্পাদকের টেবিল থেকে চূড়ান্ত হওয়ার পর কম্পিউটারে টাইপ করবে আরেকটি বিভাগের কর্মীরা- এসব করতে করতে প্রথম সংস্করণ প্রেসে চলে যাবে- তাহলে উপায়?
মোবাইল ইন্টারনেট ও অ্যান্ড্রয়েডহীন রিপোর্টিংয়ের ওই সময়টাতে খবর পাঠানো নিয়ে এমন বিপত্তি উপস্থিত অন্য রিপোর্টারদের আলোচনায়ও গুরুত্ব পেয়েছিল। তখন সংবাদের সিনিয়র রিপোর্টার এবং জাতীয় পার্টি বিটের তারকাসাংবাদিক শ্রদ্ধাজন আজমল হক হেলাল ভাই বললেন, ‘আমার সঙ্গে এসো।’
কেউ এলেন, কেউ আবার অফিস কাছাকাছি হওয়ায় দ্রুত ছুটলেন। আমরা দুতিনজন হেলাল ভাইয়ের পিছু চললাম। নিয়ে গেলেন জাতীয় পার্টির বনানীতে অবস্থিত চেয়ারম্যানে কার্যালয়ে- যা সমাবেশস্থল থেকে দুই মিনিটের হাঁটাপথ। সমাবেশ শেষে সেখানে অবস্থান করছেন এরশাদও।
আমরা পৌঁছাতেই দেখলাম নেতাকর্মীর ভিড়। আছেন তৎকালীন মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারসহ পরবর্তীতে এমপি মন্ত্রী হওয়া ১৫-২০ জন উল্লেখযোগ্য নেতা। আমাদের খবর লেখার জন্য একটি কম্পিউটার ছেড়ে দেওয়া হলো। রিপোর্ট লেখা শেষ। ই-মেইলে যে যার অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। এরপর অন্যরা চলে গেলেন। আমার আর হেলাল ভাইয়ের গন্তব্য পল্টনমুখী থাকায় আমাকে সঙ্গে রাখলেন, বললেন- ‘একসঙ্গে যাবো।’
হেলাল ভাই সোজা এরশাদের দিকে ছুটলেন, পেছনে আমি। কেউ বাধা দিলো না। এরশাদ তাকালেন। সালাম দিলেন হেলাল ভাই। কাছে ডেকে নিলেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন হেলাল ভাই। সঙ্গে সঙ্গে হাত মেলালেন এবং কোলাকুলি করলেন এরশাদ। আমার কাধে এক হাত রেখে হেলাল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললেন। আমাকে সাহস দিলেন ভয়মুক্ত প্রশ্ন করার। কয়েকটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করেছিলাম, উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। যা কোনো খবরে প্রকাশ হয়নি এবং হবেও না।
একপর্যায়ে আমাদের ডিনার করালেন। নিজ হাতে আমার মোবাইল নম্বর সেইভ করলেন তার মোবাইলে, আমিও তার নম্বর মোবাইল সংরক্ষণ করলাম। সেই থেকেই আমি ফোন করলেই ধরতেন এরশাদ। মারত্মক ব্যস্ত থাকলে পরবর্তীতে কল করতেন।
সেদিন আমি এরশাদকে মেলাতে পারছিলাম না। মাধ্যমিক থেকেই শুনে এসেছি এরশাদ স্বৈরাচার। গুলিতে নিহত নূর হোসেনের পিঠেও লেখা দেখেছি ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। সেই স্বৈরাচার এতটা স্নেহে প্রথম দিনেই বুকে টেনে নিতে পারেন একজন জুনিয়র রিপোর্টারকে - তা এ ঘটনা না ঘটলে অজানাই থেকে যেতো হয়তো।
রিপোর্ট ছাপা হলো। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এরশাদের ফোন। মোবাইল ফোনের স্ক্রীনে এরশাদের ফোনকল ভেসে উঠতেই একটা ভয় চেপে ধরলো। কি লিখেছিলাম, কি ছাপা হয়েছে- ইন্টারনেট ভার্সনও নেই আমাদের পত্রিকার, কিভাবে দেখি রিপোর্টে কোনো ঝামেলা হলো কিনা! কি জানতে চাইবেন এরশাদ- দুএক সেকেন্ডেই ভাবানগুলো ঘিরে ধরলো। ঘিরে ধরলো দ্বিধা। হাত যাচ্ছে মোবাইলের রিসিভ বাটনে, আবার ফিরছে। এমন পরিস্থিতিতে ৪-৫ সেকেন্ডেই মস্তিস্ক সিদ্ধান্ত দিলো যে- যা হয় হোক, এরশাদের ফোন এড়ানোর চেয়ে ফেইস করাই সঠিক হবে।
ধরলাম ফোন।
এরশাদের কাছের সাংবাদিকরাও তাকে স্যার সম্বোধন করতেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাজনীতিতে এসে রাষ্ট্রপতি হওয়া, জাতীয় পার্টি গঠন, দেশবিদেশের সরকার প্রধানদের সমর্থন আদায় এবং একটি বন্যা সামাল দিয়ে বৈদেশিক অর্থসহায়তা দিয়ে দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক রাখার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রশাসনকে উপজেলা পরিষদ ও উপজেলায় কারাগার স্থাপন করে বিকেন্দ্রীকরণে ধারাবাহিক সফল হওয়া এরশাদের মুখোমুখি হলাম অবশেষে।
কিন্তু ফোন রিসিভ করে সালাম দিতেই কমাণ্ডিং কন্ঠে সাবেক এই সেনাপ্রধান বললেন, ‘রুদ্র তোমার রিপোর্টটি অন্যরকম, যা চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতে খুবই উপযোগী, থ্যাংকস অ্য লট।’
এরপর থেকে এরশাদের সঙ্গে বহুবার কথা হয়েছে পেশাগত প্রয়োজনে। নিজেই ফোন করে আলোচনা তুললেন দেশ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে। তবে বড় দুটি দল তাকে কতটা অবিশ্বাস করে তা জানা ছিল এরশাদের। তাকে একটি মহল ‘বেঈমান, বেহায়া, স্বৈরাচার’ বলে থাকে তাও তার জানা ছিলো।
এক রাতে কথা বলতে বলতে নাইট ড্রেস বা স্লিপিং স্যুট পরা এরশাদ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন তরুণ প্রজন্মের প্রতি। বললেন, ‘তোমাদের প্রজন্মও কি বেঈমান, স্বৈরাচার হিসেবেই জানবে আমাকে? আমি বলছি- আমি দেশের প্রয়োজনেই সব করেছি। শপথ করে বলছি, ‘আই ওয়াজ নট অ্য টাইরান্ট প্রেসিডেন্ট।’
একটু থেমে নিজেকে সামলে কন্ঠস্বরটা একটু নিচু করে বললেন, ‘আমি কাজ কবি, তাই স্বৈরাচার বা খুনি হতে পারি না, নূর হোসেনকে আমি খুন করিনি।’ আর তার স্ত্রী বিদিশা ও রওশন প্রশ্নে বললেন- ‘দুজনকেই ভালোবাসি, কাউকে ছাড়া আমার চলে না। আমি ফ্রট (প্রতারক) নই। সকাল বিকেল কথা যে বদলাই না, তার প্রমাণ বিদিশা- রাষ্ট্রপতি হয়েও তাকে বিয়ে করেছি, ভালোবেসে ঘরে তুলেছি।’
আরো কিছু কথা হয়েছিলো- তার কবিতাগুলো নিয়ে। নিজের লেখা অনেকগুলো বইও আমাকে দিয়েছিলেন এরশাদ। তাই রিপোর্ট বিষয়ের তুলনায় কবিতার আলাপই হতো, তার ফুরফুরে মুড ও সময় হাতে থাকতো। প্রতিদিন নয়- মাঝে মধ্যে যে কথা হতো দুচার মিনিট- তাতে স্বার্থ ছিল না। নিজের কবিতার লাইন বা প্রসঙ্গ শুনলেই এরশাদের ভেতর থেকে যেনো এক কবি এরশাদ কথা বলতো- একদম কবির মতো, প্রেমিকের মতো- যেখানে স্বৈরাচার শব্দটিই নিষিদ্ধ ছিল।
ভিওডি বাংলা/আর








মন্তব্য