ইতিহাস ও বর্তমানের সন্ধিক্ষণে শহীদ জিয়া: আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা

ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ শনিবার (৩০ মে ২০২৬) জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছে এক মহান দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে। আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। এবারের এই দিনটি আমাদের সামনে শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর প্রথাগত স্মরণসভা নয়, বরং এটি এসেছে চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ‘জুলাই বিপ্লব’-এর পর এক নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।
দীর্ঘ দেড় দশকের একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশের মানুষ আজ যে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করছে, সত্য, ন্যায় এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে টেকসই বাংলাদেশ গড়ার যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে—সেই পুনর্গঠনের মুহূর্তে শহীদ জিয়ার আদর্শ, সততা ও রাজনৈতিক দর্শন আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক অনুকরণীয় পাথেয়।
একটি সময় ছিল, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে বিগত স্বৈরাচারী সরকার বারবার চেষ্টা করেছে শহীদ জিয়ার নাম, বীরত্ব ও অবিনশ্বর অবদানকে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে। হীন রাজনৈতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ থেকে শুরু করে ‘জিয়া উদ্যান’ পর্যন্ত নানা প্রতীকী স্মারক ও নাম একে একে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়ে তাঁর সহধর্মিণী, দেশের আপসহীন নেত্রী ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এক পর্যায়ে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শহীদ জিয়ার পবিত্র মাজার শরিফটি পর্যন্ত সরিয়ে ফেলার চক্রান্ত করা হয়েছিল—যা ছিল মূলত একটি স্বাধীন জাতির আত্মপরিচয় ও গৌরবময় ইতিহাসের মূলে কুঠারাঘাত করার অপচেষ্টা।
কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম এবং সত্যের শক্তি অমোঘ। ইতিহাসকে কখনো স্বৈরাচারের গায়ের জোর বা কলমের কালিতে মুছে ফেলা যায় না। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, জনগণের হৃদয়ে যে নেতার স্থান, তাকে রাষ্ট্রীয় ডিক্রি জারি করে মুছে ফেলা অসম্ভব।
শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু একজন সফল রাষ্ট্রপ্রধানই ছিলেন না—তিনি ছিলেন সততা, আত্মত্যাগ ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। ১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালি জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে, এক অন্ধকার ও দিকভ্রান্ত সময়ে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর অবিনাশী কণ্ঠের স্বাধীনতার ঘোষণা সারা দেশকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। সেই ঘোষণা বাঙালি জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক সাহস ও দিকনির্দেশনা জুগিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর, দেশের শাসনব্যবস্থা যখন একদলীয় বাকশালের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল, তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতার হাল ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের পথ উন্মুক্ত করে দেশে একটি সুস্থ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারার রাজনীতি প্রবর্তন করেন। তাঁর দূরদর্শিতার আরেকটি বড় প্রমাণ ছিল কালজয়ী ‘১৯-দফা কর্মসূচি’। এটি কেবল কিছু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল না, বরং ছিল জাতীয় উন্নয়নের এক বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা। স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব, গণশিক্ষা ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে তিনি কৃষিনির্ভর বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ আমরা যে রেমিট্যান্স বা তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করে অর্থনীতির স্বপ্ন দেখি, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও জনশক্তি রপ্তানির সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও জিয়াউর রহমান ছিলেন এক অনন্য দূরস্রষ্টা। স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেছিলেন—"সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়"। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান রূপকার হিসেবে তিনি যে আঞ্চলিক সংলাপ ও শান্তির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা আজও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক নির্মম সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর শাহাদাত বরণ কেবল একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতির প্রস্থান ছিল না; বরং তা ছিল একটি উদীয়মান, আত্মমর্যাদাশীল ও স্বনির্ভর রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার ওপর এক প্রচণ্ড আঘাত। আজ এত বছর পর পেছন ফিরে তাকালে সচেতন যে কেউ অনুধাবন করতে পারেন—সেই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বহু বছর পিছিয়ে দেওয়ার একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রান্ত সফল করা হয়েছিল।
আজকের এই মহতী দিনে আমরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। জুলাই বিপ্লবের পর আমাদের সামনে যে রাষ্ট্র সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে, সেখানে শহীদ জিয়ার ‘দেশপ্রেম ও সততা’ হতে পারে আমাদের মূলধন। আসুন, এই ঐতিহাসিক ক্ষণে আমরা নতুন করে শপথ নিই—তাঁর প্রদর্শিত পথ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং দেশপ্রেমের চেতনাকে বুকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনে আমরা সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়, শহীদ জিয়া—আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসে চির অম্লান ও অমর সন্তান।
লেখক: কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র।
নির্বাহী পরিচালক, জিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাডেমী (জিয়া)।
ভিওডি বাংলা/এফএ







