• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অর্জন

জুবায়ের হাসান    ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:৩৮ পি.এম.
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি:পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চীন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি:পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চীন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। গত ২১ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে তিনি দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা ত্যাগ করেন। এরপর ২২ জুন মালয়েশিয়া থেকে চীন সফরে যান। ২৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এ সফরে তাঁর সঙ্গে ছিল। ২৬ জুন রাতে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরেন। প্রায় ২৫ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও চীনের মাটিতে পা রাখলেন। এর আগে ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী হিসেবে তিনি চীন সফর করেছিলেন। সে সময় বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনাতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচি পালন করেন। ২২ জুন রাতে তিনি দালিয়ানে পৌঁছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে দুই দিনের কর্মসূচি শেষে ২৪ জুন বিকেলে হাই-স্পিড ট্রেনে বেইজিং যান। ২৫ জুন বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’ থেকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রায় তিনি গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পৌঁছান। সেখানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। পরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়।

চীনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’-এ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রেস উইং যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, শিল্পায়ন, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কে চীনা বিনিয়োগ, বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের বিষয়ে দুই দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। বিশেষ করে চীনের উৎপাদন শিল্পের একটি অংশ বাংলাদেশে স্থানান্তর, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ব্যাংকিং, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা, বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের চীনে বাণিজ্যিক রপ্তানি, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অধিকতর বৃত্তি ও সহজতর ভিসা সুবিধা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা এবং ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রেও চীন ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

সর্বোপরি, এই সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের ৫০ বছরের সম্পর্ক এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। চীনের প্রধানমন্ত্রীও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চীন দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীও উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক সহযোগিতার জন্য চীনের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান এবং তাঁকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

পরদিন ২৬ জুন সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রতিনিধিদল নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রায় ৫০ মিনিটব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশ ও চীন ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, চীন সবসময়ই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অবিচল রয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মৌলিক দিকনির্দেশনা থেকে বেইজিং কখনো সরে আসবে না। তিনি বলেন, চীন সবসময় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টার প্রতি চীন পূর্ণ সমর্থন জানায় এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে। শি জিনপিং আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময়, বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি, কৌশলগত সংলাপ জোরদার এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা আরও গভীর করতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি জানান, বাংলাদেশের নতুন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীন তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয়, অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে সহযোগিতা এবং সবুজ ও নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে বেইজিং আগ্রহী। তিনি স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের পারস্পরিক বিনিময় বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিসি) এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে শি জিনপিং বলেন, উভয় দেশ সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন প্রতিষ্ঠায় যৌথভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দুই দেশের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায়ও একসঙ্গে কাজ করবে।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকীতে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, চীন একটি মহান দেশ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায়ে’ উন্নীত করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন অসাধারণ উন্নয়ন অর্জন করেছে এবং চীনা আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য উন্নয়ন মডেল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিআরআই সহযোগিতা জোরদার এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য, সংযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশও তার আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। তারেক রহমান পুনর্ব্যক্ত করেন যে বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে, তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের পূর্ণ কর্তৃত্বকে বাংলাদেশ সমর্থন করে। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায়’ গঠনের ধারণা এবং তাঁর চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ বিশ্ব শান্তি, টেকসই উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ এসব উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানায় এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা আরও জোরদার করতে প্রস্তুত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি ১৫ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিস্তৃত মতবিনিময় হয়েছে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে। ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর গত পাঁচ দশকে দুই দেশের পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা ও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে আরও গভীর হয়েছে বলেও যৌথ ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়।

চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে তার কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। উভয় দেশ বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

যৌথ ঘোষণায় উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ, সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠন এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পুনর্ব্যক্ত করে। অপরদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। 

অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), শিল্পায়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরবরাহ শৃঙ্খল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষির আধুনিকায়নে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, সবুজ জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে উভয় দেশ একমত হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

যৌথ ঘোষণায় সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী খনন ও প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তা এবং দ্রুত যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়।

জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা, গবেষণা, গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া বিনিময় এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায়’ গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহের প্রতি সমর্থন জানায়। অন্যদিকে চীন ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে। পাশাপাশি জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতি দুই দেশ তাদের অভিন্ন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে।

রোহিঙ্গা সংকটের প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে। চীনও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা জানিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও টেকসই সমাধানের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

এদিকে প্রতিনিধিদল-পর্যায়ের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আলাদাভাবে একান্ত বৈঠক করেন। কূটনৈতিক মহলের অনেকের মতে, প্রতিনিধিদল-পর্যায়ের বৈঠকের পর পৃথক একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া দুই নেতার পারস্পরিক গুরুত্ব, আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।

 লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। ছবি: সংগৃহীত
তারেক রহমানের আস্থার বৃত্তে এক মার্জিত মুখ আতিকুর রহমান রুমন
ছবি: ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স
যে শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তার জন্য এত অন্যায় কেন?
রিয়াজুল হক: ছবি-ভিওডি বাংলা
অজানা অ্যাপ ও ফিশিং লিংক: প্রতারণার নতুন প্যাটার্ন