শরিকদের বার্তা
জাতীয় সরকার চাই, একলা চললে দায় নেব না

নির্বাচনের আগে দেওয়া জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ক্ষমতায় বৃহত্তর অংশীদারত্ব নিশ্চিত এবং সরকার ও জোটের মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদারের দাবি তুলেছেন বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোট ও দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। একই সঙ্গে সরকারের অর্থনৈতিক উদ্যোগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রশংসা করলেও রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে তারা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—সরকার যদি এককভাবে চলার নীতি অনুসরণ করে, তবে সম্ভাব্য ব্যর্থতার দায় শরিকরা নেবেন না। সোমবার (২১ জুলাই) রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় ও নৈশভোজে এসব বিষয় উঠে আসে।
সরকার গঠনের পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, আন্দোলনের সময় একসঙ্গে পথচলা, নির্বাচন এবং জাতীয় সরকার গঠনের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল, সরকার গঠনের পর তার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শরিকদের মধ্যে অসন্তোষ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কেউ সরকারে আরও বিস্তৃত অংশীদারত্বের দাবি জানান, আবার কেউ জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়টি সামনে আনেন।
বৈঠকে শরিক নেতারা বলেন, বিএনপি ও জোটসঙ্গীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অবিশ্বাস, অনাস্থা ও ক্ষোভের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জোটের জন্য ইতিবাচক নয়। আলোচনার একপর্যায়ে একজন নেতা প্রশ্ন তোলেন, এটি ‘ওয়েলকাম ডিনার’, নাকি ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি ‘ওয়েলকাম ডিনার’।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে সরকার ও দলের কিছু ঘাটতির কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়নে শরিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চান। ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে শরিকদের সঙ্গে বৈঠক, তাদের পরামর্শ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার আশ্বাসও দেন তিনি। তবে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেননি।
বৈঠকে শেষে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকতাটা ভালো হয়েছে; কিন্তু আলোচনার প্রশ্ন যদি বলেন, কোনো এজেন্ডা ছিল না। কেউ বক্তৃতা করেছেন, কেউ কেউ সরকারের অংশ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ রকম বলেছেন যে আমরা অংশীদার হতে চাই ক্ষমতার। কেউ কেউ এ রকম বলেছেন যে যাঁরা যাঁরা যেভাবে চালাচ্ছেন সেগুলো আমরা কিছুই জানি না। আমরা অংশ নিতে পারছি না।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বিগত কয়েক মাসে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ভালোমন্দের বিষয়ে কথা হয়েছে বলেও জানান মাহমুদুর রহমান মান্না।
বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল শরিকদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ। সাইফুল হক ও সুব্রত চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের সময় শরিকদের গুরুত্ব দেওয়া হলেও সরকার গঠনের পর তারা উপেক্ষিত হয়েছেন। সরকারি অনুষ্ঠান, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, এমনকি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও শরিকদের সঙ্গে কোনো সমন্বয় হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।
আরেকটি সূত্র জানায়, সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরিক নেতাদের আমন্ত্রণ না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন সুব্রত চৌধুরী। তিনি অভিযোগ করেন, “সরকারের অনেক অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু সেখানে শরিক দলের নেতাদের দাওয়াত দেওয়া হয় না।”
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন থেকে চেষ্টা করব, সবাইকে নিয়ে চলার।’
অনুষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, মাহমুদুর রহমান মান্না শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তার সামনে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের মতো রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও শরিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন ইসলামি দলের নেতা অভিযোগ করেন, মন্ত্রিসভায় বামপন্থি ও তরুণ নেতাদের স্থান দেওয়া হলেও ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন দলগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
১২ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল করিম খান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিলো এক সাথে আন্দোলন, এক সাথে সরকার গঠন। যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এ নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির দুরুত্ব তৈরি হয়। এ অবস্থায় শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে জোটকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মাঠপর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি অনেকটা নেই বললেই চলে। আর সেই সুযোগে নানা ধরনের সরকার বিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে বিরোধী দল। এজন্য সরকার পরিচালনার পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও জোরদার করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মিত্রদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজ করেছেন। এতে শরিক নেতারা সম্মানিত বোধ করছেন।
গণঅধিকার পরিষদের নেতা আবু হানিফ জানান, শরিকরা তৃণমূলে বিএনপির একক আধিপত্যের কারণে সৃষ্ট বিরোধ, যুগপৎ আন্দোলনের বাস্তবতা ও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে শুনে শরিকদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়েছেন।
গণফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবাইকে অতীতের মতোই দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে কোনো বিভেদ তৈরি হয়নি।
উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। সরকার গঠনের পর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে শরিকদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সমন্বয়, আস্থার সংকট এবং জাতীয় সরকার গঠনের প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
ভিওডি বাংলা/সবুজ/আ








মন্তব্য