ওডিসি: নারীরাই যে গল্পের চালিকাশক্তি

প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর পুরোনো মহাকাব্য ‘ওডিসি’-কে সাধারণত বীর যোদ্ধা ওডিসিউসের ঘরে ফেরার কাহিনি হিসেবে দেখা হয়। তবে গবেষকদের মতে, এটি শুধু বীরত্বের গল্প নয়; বরং যৌনতা, কৌশল এবং ক্ষমতার এক জটিল বর্ণনা, যেখানে নারীরাই গল্পের গতিপথ নির্ধারণ করেন।
পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন চলচ্চিত্রে ‘ওডিসি’ বড় পর্দায় আসার প্রাক্কালে মহাকাব্যটির নতুন পাঠ নিয়ে আলোচনা আবারও সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওডিসিউস প্রধান চরিত্র হলেও তার যাত্রার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রভাব ফেলেছেন নারী, অপ্সরা, জাদুকরী এবং দেবীরা।
মহাকাব্যের শুরুতেই দেখা যায়, ট্রয় যুদ্ধ শেষে নিজ রাজ্য ইথাকায় ফেরার পথে ওডিসিউস সাত বছর ধরে অপ্সরা ক্যালিপসোর দ্বীপে আটকে আছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি অপ্রতিরোধ্য বীর হলেও সেখানে তাকে অসহায় ও দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়। দেবতাদের হস্তক্ষেপের পরই তিনি দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
এদিকে তার স্ত্রী পেনেলোপি ইথাকায় বসে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করলেও নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। রাজপ্রাসাদে আসা ১০৮ জন পাত্রের বিয়ের প্রস্তাব তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বছরের পর বছর এড়িয়ে যান। শ্বশুরের জন্য কাফনের কাপড় দিনে বুনে রাতে খুলে ফেলার কৌশল ‘ওডিসি’র অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
গবেষকদের মতে, দেবী অ্যাথেনা মহাকাব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর একটি। তিনিই ওডিসিউসকে নিরাপদে দেশে ফিরতে সহায়তা করেন। বিভিন্ন সময়ে পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি ওডিসিউস ও তার ছেলে টেলেম্যাকাসকে সাহায্য করেন। এর মাধ্যমে হোমার দেখাতে চেয়েছেন, ক্ষমতা পুরুষদের হাতে থাকলেও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে নারীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ওডিসিউসের যাত্রাপথে আরও কয়েকজন নারী চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। সাইরেনদের মধুর গান নাবিকদের মৃত্যুর দিকে টেনে নেয়। সেই গান শোনার আকাঙ্ক্ষায় ওডিসিউস নিজেকে জাহাজের মাস্তুলে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন, যাতে তিনি সাগরে ঝাঁপ দিতে না পারেন।
একইভাবে জাদুকরী সার্সি প্রথমে ওডিসিউসের সঙ্গীদের শূকরে রূপান্তরিত করলেও পরে তাকে সাহায্য করেন পাতালপুরীতে যেতে, যেখানে ভবিষ্যদ্বক্তা টিরেসিয়াসের কাছ থেকে তিনি ইথাকায় ফেরার পথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পান।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ওডিসি’র নারী চরিত্রগুলো কেবল প্রলোভনের প্রতীক নয়; তারা জ্ঞান, ক্ষমতা, কৌশল ও রূপান্তরেরও প্রতীক। ওডিসিউসের সামনে তারা বারবার এমন পরীক্ষা হাজির করেন, যেখানে টিকে থাকতে তাকে প্রলোভনের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করে সংযম বজায় রাখতে হয়।
এ কারণেই ওডিসিউসকে শুধু যুদ্ধজয়ী নায়ক নয়, বরং দুর্বলতা, কৌশল, প্রতারণা ও মানবিক সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ এক জটিল চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন হোমার। গবেষকদের মতে, এই মানবিক বৈশিষ্ট্যই ‘ওডিসি’কে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী মহাকাব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য