মালয়েশিয়া দিয়েই শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়। সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২১ ও ২২ জুন কুয়ালালামপুর সফরের প্রস্তুতি চলছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণেই এই সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। সফরকালে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন বৈঠকেও অংশ নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত কিংবা চীনের উদ্দেশে রওনা হতে পারেন। তবে কোন দেশটি দ্বিতীয় গন্তব্য হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্রের দাবি, চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বেইজিং চাইছে জুনের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী দেশটি সফর করুন। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গেও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে মালয়েশিয়া সফরের পর দিল্লি নাকি বেইজিং-সেটি নির্ধারণে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন সরকারের বৈদেশিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জাতীয় স্বার্থ। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় প্রবাসী কল্যাণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সফরেও এসব বিষয়ই অগ্রাধিকার পাবে। বিশেষ করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। বর্তমানে দেশটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয়, চুক্তি লঙ্ঘন, শ্রমিক হয়রানি এবং বিভিন্ন মানবিক সমস্যা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সরকার এসব বিষয়ে কার্যকর সমাধানের পথ খুঁজতে আগ্রহী।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সফরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা শুল্ক সুবিধা পেতে পারেন, যা রপ্তানি ও আমদানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে আম রপ্তানির সম্ভাবনাও আলোচনায় আসতে পারে। মালয়েশিয়ায় বড় বাংলাদেশি কমিউনিটি থাকায় দেশটি বাংলাদেশের ফল ও খাদ্যপণ্যের জন্য সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সফরে হালাল খাদ্য শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় গন্তব্য। শিক্ষা খাতে নতুন সহযোগিতা তৈরি হলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে পাম অয়েল ও জ্বালানি সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়।
নীতিনির্ধারকদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেবে।
মালয়েশিয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যদি ভারত সফর করেন, তাহলে তা হবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরকে ঘিরেও দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ জোরদার হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফরও ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে বিবেচিত।
চীন সফর হলে তিস্তা প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
বাংলাদেশকে একই সঙ্গে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই নতুন সরকার এগোতে চায়।
তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও হয়ে উঠতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে। সেই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/জা







