হামের টিকা
ইউনিসেফের সতর্কতাও গায়ে মাখেনি ইউনূস সরকার

টিকা ক্রয়প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের হুট করে আনা নীতি পরিবর্তনের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশকে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশে হামের রুটিন টিকার তীব্র সংকট চলায় চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই মারাত্মক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার বড় অংশই শিশু। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৭৫ শিশুর। বাংলাদেশের ইতিহাসে আড়াই দশকে হামে এত বিপুল সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা আর ঘটেনি।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর ইউনিসেফ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব তথ্য জানান। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই সংবাদ সম্মেলনে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি, টিকার সংকট ও এর কারণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই সম্ভাব্য ভয়াবহ টিকা-সংকটের কথা উল্লেখ করে তারা ২০২৪ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্তত ৫ থেকে ৬টি চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছিল। এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০টি জরুরি বৈঠকও করা হয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি।
রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের (ওপেন টেন্ডার) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি টিকা কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তই মূলত সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে।
তিনি বলেন, ‘টিকা কেনা সাধারণ ওষুধ কেনার মতো বিষয় নয়, এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি প্রক্রিয়া। এখানে শুধু কম দামের বিষয়টি বিবেচ্য নয়, বরং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত নিরাপদ ও কার্যকর টিকা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে টিকা সংগ্রহ করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। অথচ ইউনিসেফের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে এই টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল।’
তিনি আরও জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঠানো চিঠিগুলোর মধ্যে শেষ চিঠিটি বর্তমান নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার ঠিক আগে পাঠানো হয়েছিল, যেন যিনি নতুন করে এই দায়িত্ব পাবেন তার ডেস্কে বিষয়টি শুরুতেই থাকে। ইউনিসেফ ক্রমাগত সতর্ক করছিল যে, সময়মতো টিকা না আনলে দেশ বড় সংকটে পড়বে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদানে এই গাফিলতিই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে গত আড়াই দশকে কখনও হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল গড়ে ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০-এর ঘরে, আর এই সময়ে হামে কোনো মৃত্যুর ঘটনাই ছিল না। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যেই ৪৭৫টি শিশু মারা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ হামের টিকা এসেছিল, যা ছিল মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না।
অবশ্য রানা ফ্লাওয়ার্স একটি ভালো খবরও দিয়েছেন। তিনি জানান, মে মাসে দেশে আবার হামের রুটিন টিকা এসেছে এবং এরইমধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেয়া হয়েছে। ফলে সংক্রমণ এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসছে।
টিকা সংকট ও শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে সরকারের বর্তমান উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, ‘ইউনিসেফ সবসময় সত্যের পক্ষে এবং এই তদন্তে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’ তবে এখন কাউকে দোষারোপ না করে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ভিওডি বাংলা/আ







