যে কারণে ফের আলোচনায় ওসামা বিন লাদেন

আল কায়েদার সাবেক প্রধান ওসামা বিন লাদেন দীর্ঘ সময় পর আবার আলোচনায়। প্রায় এক দশক আগে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ঝড়ো অভিযান চালিয়ে তাকে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিল বাহিনী। তবে এতদিন পর প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) নতুন এক প্রতিবেদন।
এতে বলা হয়েছে, অভিযানের কয়েক মাস আগেই তিনি তার গোপন আস্তানা থেকে প্রায় সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। শুক্রবার প্রকাশিত সিআইএর হালনাগাদ নথিতে দেখা যায়, অ্যাবোটাবাদে অবস্থান করেই বিন লাদেন একদিকে আল কায়েদার কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন, অন্যদিকে গোপন আস্তানা ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। খবর বিদেশী গণমাধ্যমের।
অভিযানের সময় উদ্ধার করা চিঠিপত্র অনুযায়ী, তাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেয়া দুই ভাইয়ের চাপের মুখে তিনি স্থান পরিবর্তনের পরিকল্পনায় লিখিত সম্মতি দেন। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারির এক চিঠিতে তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেখেন, তারা তার নিরাপত্তার জন্য ভারী দায়িত্ব বহন করছেন। এরপর ২রা ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালের আরেকটি চিঠিতে তিনি জানান, ওই দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা হতে চাইছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। বিন লাদেন এতে সম্মতি দিয়ে দায়িত্ব অন্যদের হাতে তুলে দেয়ার কথা বলেন এবং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন।
সিআইএ জানিয়েছে, এই স্থানান্তর পরিকল্পনার বিষয়ে সে সময় মার্কিন গোয়েন্দাদের কোনো ধারণাই ছিল না। তারা মনে করছিলেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে, অথচ বিন লাদেনের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত যদি বিলম্বিত হতো, তাহলে এই ঘটনার পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময় বিন লাদেন শুধু প্রতীকী নেতা ছিলেন- এমন ধারণা সঠিক নয়। তিনি তখনও আল-কায়েদার কৌশলগত, অপারেশনাল ও ট্যাকটিক্যাল পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং সংগঠনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করছিলেন।
অ্যাবোটাবাদের সূত্র খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হয় আরও আগে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার (সেপ্টেম্বর ১১ হামলা) পর। সিআইএ নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা তৎপরতা বিন লাদেনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের খুঁজতে শুরু করে। একটি বড় অগ্রগতি আসে তার বিশ্বস্ত এক কুরিয়ারকে অনুসরণ করার মাধ্যমে, যিনি কেবল ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। বহু বছর পর সেই পরিচয় আসল ব্যক্তির সঙ্গে মেলানো সম্ভব হয়।
২০১০ সালের আগস্টে গোয়েন্দারা ওই কুরিয়ারকে খাইবার পখতুনখাওয়া প্রদেশের অ্যাবোটাবাদ শহরের একটি কম্পাউন্ডের সঙ্গে যুক্ত দেখতে পান। সিআইএ ওই কম্পাউন্ডকে অস্বাভাবিক হিসেবে চিহ্নিত করে। সেখানে ছিল উঁচু দেয়াল, কাঁটাতারের বেড়া, ডাবল গেট, অস্বচ্ছ জানালা, কোনো দৃশ্যমান ইন্টারনেট বা টেলিফোন সংযোগ নেই এবং সব আবর্জনা বাইরে না ফেলে ভেতরেই পুড়িয়ে ফেলা হতো।
এছাড়া নিবন্ধিত মালিকদের কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎসও ছিল না। এসব কারণে বিশ্লেষকরা ধারণা করেন, এই কম্পাউন্ডে বিন লাদেন এবং ওই কুরিয়ারকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
টার্গেট শনাক্ত হওয়ার পর অভিযান প্রস্তুতি জোরদার করা হয়। সিআইএ পূর্ণাঙ্গ আকারে ওই কম্পাউন্ডের একটি প্রতিরূপ তৈরি করে, যাতে ভেতরের বিন্যাস অনুশীলন করে হামলা দল প্রস্তুতি নিতে পারে। ২০১১ সালের ২৯ এপ্রিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিযান অনুমোদন করেন। এটি ছিল একটি সূক্ষ্ম পরিকল্পিত অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি কমানো এবং বিন লাদেনের পরিচয় নিশ্চিত করা।
২০১১ সালের ২ মে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হেলিকপ্টার উড়ে গিয়ে পাকিস্তান সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে অ্যাবোটাবাদের কম্পাউন্ডে পৌঁছে। একটি হেলিকপ্টার অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হলেও অভিযান থেমে থাকেনি। বিন লাদেনকে তৃতীয় তলায় শনাক্ত করা হয় এবং প্রায় ৯ মিনিটের মধ্যে তাকে হত্যা করা হয়।
পরে তার মরদেহ নিচতলায় নিয়ে নিরাপদ করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ নথি ও ডিজিটাল উপকরণ উদ্ধার করা হয়, যা পরবর্তীতে গোয়েন্দা বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সদস্য ও উদ্ধারকৃত সামগ্রী সরিয়ে নেয়া হয় এবং বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি সেখানেই ধ্বংস করা হয়।
অভিযানের সময় প্রেসিডেন্ট ওবামা সিচুয়েশন রুম থেকে সরাসরি পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাৎক্ষণিক আপডেট পান। পরে একাধিক পদ্ধতিতে বিন লাদেনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
সিআইএ জানায়, এটি ছিল একটি সার্জিক্যাল অপারেশন, যার লক্ষ্য ছিল সীমিত ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু অর্জন করা। অ্যাবোটাবাদ থেকে উদ্ধার করা তথ্য পরে সিআইএ-নেতৃত্বাধীন বহু সংস্থার একটি টাস্কফোর্স বিশ্লেষণ করে, যা আল-কায়েদার কার্যক্রম, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২রা মে উত্তর আরব সাগরে অবস্থিত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কার্ল ভিনসন থেকে বিন লাদেনের মরদেহ সমুদ্রে দাফন করা হয়।
সিআইএ উপসংহারে বলেছে, বিন লাদেনের মৃত্যু আল-কায়েদার বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও একমাত্র আমির ছিলেন এবং এর পরিচিতি, অর্থ সংগ্রহ ও বৈশ্বিক কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতেন।
প্রতিবেদনটি জোর দিয়ে বলেছে, ৯/১১ হামলার পর বছরের পর বছর ধরে চালানো গোয়েন্দা তৎপরতা, বিভিন্ন সংস্থা ও সামরিক অংশীদারদের সমন্বয়ের ফলেই এই অভিযানের সফলতা আসে। ‘সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সিআইএ’- প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/এসআর







