আইএমএফ
ইরান যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়বে

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সংস্থাটির ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আইটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি যেটা হতে পারে, তাহল তেল, গ্যাস ও খাদ্যের দাম বেড়ে চলতি বছর ও আগামী বছরজুড়ে অপরিবর্তিত থাকবে। সেক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে বৈশ্বিক মন্দার খুব কাছাকাছি পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা ১৯৮০ সালের পর মাত্র চারবার ঘটেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ হল কোভিড-১৯ মহামারির সময়।
এখন থেকে ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে যুদ্ধ শুরুর পরপরই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর গত সপ্তাহে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে।
আইএমএফ বলেছে, ‘আবারও বৈশ্বিক অর্থনীতি পথচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে—এবার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে।’ সংস্থাটি আরও বলেছে, তেলের দাম চলতি বছর গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে ২০২৭ সালে ১২৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে আইএমএফ বলেছে, আগামী বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করতে পারে।
আইএমএফ-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গোরিনচা বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বৈশ্বিক মন্দা ধারণাটি কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সুতরাং, ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এমন একটি পরিস্থিতি যা বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের কাছে মন্দার সময়ের মতো মনে হবে। বেকারত্ব বাড়বে। কিছু দেশের জন্য, খাদ্যপণ্যের দাম এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে।
ইরান সংঘাতের সময় তেলের দাম প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু তারপর থেকে তা কমে গেছে এবং আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৮.৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া আইএমএফ উল্লেখ করেছে যে, যদি এই গুরুতর পরিস্থিতি দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে মন্দার ঝুঁকি কেবল বাড়বে। সংস্থাটি বলেছে যে, যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাতের সমাধান হয় এবং এই বছরের মাঝামাঝি নাগাদ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও রফতানি স্বাভাবিক হতে শুরু করে, তাহলে ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.১ শতাংশ হবে।
এটি আগের ৩.৩ শতাংশের পূর্বাভাসের চেয়ে কম। সংস্থাটি আগামী বছরের জন্য তার বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৩.২ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর ব্যাপারে আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়ে বলেছে যে, ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটে যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সংস্থাটি চলতি বছর যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৮ শতাংশ করেছে। তবে সংস্থাটি আশা করছে যে এরপর যুক্তরাজ্য ১.৩ শতাংশ অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াবে।
আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে এই বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে তীব্র মন্দা বা এমনকি সংকোচনও দেখা যেতে পারে।
সংস্থাটির অনুমান অনুযায়ী, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটে, তাহলে ২০২৭ সালে ৩.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান সরবরাহকারী দেশ কাতারের মতো কিছু দেশকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি শোধনাগার কাতারের রাস লাফান আক্রান্ত হয়েছে এবং এটি আরও কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে না।
আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৬ সালে কাতারের অর্থনীতি ৮.৬ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে পরের বছর তা ৮.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে।
সংস্থাটি আরও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, যুদ্ধের কারণে এ বছর ইরানের প্রতিবেশী দেশ ইরাকের অর্থনীতি ৬.৮ শতাং< হ্রাস পাবে। তবে ২০২৭ সালে তা ১১.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইএমএফ বলেছে, কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে, যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং বিকল্প রফতানি পথের প্রাপ্যতা।
উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন রয়েছে যা পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল সরবরাহ করতে পারে।
২০২৬ সালে সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে। কিন্তু অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ হারে প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং আগামী বছর তা ৪.৫ শতাংশ হারে বাড়বে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
আইএমএফ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ তেল রফতানিকারক দেশের জন্য আগামী বছর অর্থনৈতিক উন্নতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, ‘এই অনুমানের ভিত্তিতে যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানি উৎপাদন এবং পরিবহন স্বাভাবিক হয়ে যাবে’।
তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, ‘যদি সংঘাতের সময়কাল দীর্ঘায়িত হয় এবং ক্ষতির মাত্রা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, তবে এই অনুমানটি সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে’।
আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে লাভবান হওয়া দেশগুলোর মধ্যে একটি হলো রাশিয়া। দেশটির অর্থনীতি চলতি বছর এবং আগামী বছর ১.১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা যথাক্রমে ০.৮ শতাংশ এবং ১ শতাংশের পূর্ববর্তী পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
চার বছরেরও বেশি সময় আগে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন চালানোর পর রাশিয়ার ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। গত মার্চ মাসে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তিনি ৩০ দিনের জন্য ইরানের ১৪ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর থেকেও সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
ভিওডি বাংলা/এসআর







